বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা হলো ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট বা আইসিইউ। এখানে ভর্তি হন গুরুতর অসুস্থ রোগীরা, যাদের জীবন অনেক সময় সূক্ষ্ণ এক ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। এই জায়গাটিই যদি ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর আক্রমণে আক্রান্ত হয়, তবে তা শুধু একটি হাসপাতালের সমস্যা নয়; বরং জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ সতর্কবার্তা। সামপ্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার প্রাপ্তবয়স্কদের আইসিইউতে ‘ক্যানডিডা অরিস’ নামের একটি ছত্রাক ছড়িয়ে পড়ছে, যা প্রচলিত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী। উন্নত দেশগুলোতে যেখানে সংক্রমণের হার নগণ্য, সেখানে আমাদের আইসিইউতে প্রায় সাত শতাংশ রোগীর শরীরে এই ছত্রাক পাওয়া গেছে। আরও উদ্বেগজনক হলো, আইসিইউতে থাকার সময়ই এক-তৃতীয়াংশের বেশি রোগী সংক্রমিত হয়েছেন। এটি স্পষ্টভাবে হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়। অর্থাৎ রোগীরা চিকিৎসা নিতে এসে নতুন সংক্রমণের শিকার হচ্ছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা। প্রচলিত প্রথম ও দ্বিতীয় সারির অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ছে। ফলে চিকিৎসকের হাতে কার্যকর বিকল্প কমে যাচ্ছে, রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে এবং চিকিৎসা ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি কেবল চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। এখনই জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। হাসপাতালগুলোতে নিয়মিত জীবাণুনাশক ব্যবহার, স্বাস্থ্যকর্মীদের হাত ধোয়ার অভ্যাস নিশ্চিত করা এবং উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ইউনিটে স্ক্রিনিং চালু করা অপরিহার্য। পাশাপাশি অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের নির্বিচার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি প্রেসক্রিপশনের পেছনে যুক্তি থাকতে হবে, যাতে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিরোধী জীবাণুর সংখ্যা না বাড়ে। জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দ্রুত নির্দেশিকা জারি করতে হবে, যেখানে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, স্ক্রিনিং নীতিমালা, ল্যাবরেটরি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জরুরি রিপোর্টিং ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, কারণ তারা প্রতিদিন সংক্রমণের ঝুঁকির মুখে থাকেন। সবশেষে বলা যায়, আইসিইউতে সুপারবাগের বিস্তার আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য একটি নীরব সংকট। যদি এটি সাধারণ ওয়ার্ড বা বৃহত্তর কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হবে। হাসপাতাল রোগ নিরাময়ের জায়গা, সংক্রমণের উৎস নয়- এই বিশ্বাস রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তাই এখনই সচেতনতা, প্রস্তুতি এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নীরব সংকটকে অবহেলা করলে এর প্রতিক্রিয়া হতে পারে নির্মম।