হরমুজ প্রণালি সংকট

বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা

এফএনএস | প্রকাশ: ৭ মার্চ, ২০২৬, ০৫:২০ এএম
বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার কঠিন পরীক্ষা

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিয়ে ইরান ও তার বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) যে বার্তা দিয়েছে, তা কেবল আঞ্চলিক উত্তেজনা নয়-বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তিকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। এক ফোঁটা তেলও বাইরে যাবে না-এমন হুমকি এবং চলাচলকারী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার সতর্কতা আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ব্রেন্ট তেলের দাম ইতোমধ্যে বেড়ে প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছেছে; সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে বৃদ্ধি প্রায় ১০ শতাংশ। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে ব্যারেলপ্রতি দাম ১০০ ডলার ছাড়াতে পারে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ১৩ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল-সমুদ্রপথে বাণিজ্যকৃত মোট তেলের ৩১ শতাংশ-এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে রপ্তানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশও ঝুঁকিতে পড়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার-এর রাস লাফান ও মেসাইদ শিল্পাঞ্চলে ড্রোন হামলার পর উৎপাদন স্থগিতের খবর পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করেছে। এই সংকটে সবচেয়ে নাজুক অবস্থানে দক্ষিণ এশিয়া। পাকিস্তানের এলএনজি আমদানির নির্ভরতা ৯৯ শতাংশ, বাংলাদেশের ৭২ শতাংশ এবং ভারতের ৫৩ শতাংশ-যার বড় অংশ আসে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দৈনিক ১,৩০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস ঘাটতির প্রেক্ষাপটে সরবরাহে বিঘ্ন নতুন করে বিদ্যুৎ, শিল্প ও মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। পাকিস্তানের পরিস্থিতিও অনুরূপ ভঙ্গুর। বিকল্প সরবরাহ সীমিত এবং স্পট মার্কেটে প্রতিযোগিতা বাড়লে দরিদ্র অর্থনীতিগুলো বেশি মূল্যচাপের মুখে পড়বে। পূর্ব এশিয়ায় চিত্র কিছুটা ভিন্ন। চায়না বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক; ইরানের তেলের বড় ক্রেতাও তারা। তাদের কাছে প্রায় ৭.৬ মিলিয়ন টন এলএনজি মজুত রয়েছে, যা স্বল্পমেয়াদে স্বস্তি দিতে পারে। তবে প্রণালিতে দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা দেখা দিলে চীনকে আটলান্টিক কার্গোর জন্য ইউরোপের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে-যা এশিয়াজুড়ে দামের চাপ বাড়াবে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া-এর তেল আমদানির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর (যথাক্রমে ৭৫ ও ৭০ শতাংশ)। যদিও তাদের এলএনজি মজুত দুই থেকে চার সপ্তাহের চাহিদা সামাল দিতে পারে, তবু দীর্ঘ সংকটে শিল্প উৎপাদন ও ভোক্তা দামে প্রভাব পড়বে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তাৎক্ষণিক ঘাটতির চেয়ে মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকিই বেশি প্রকট হতে পারে। এই বাস্তবতায় জরুরি হলো কূটনৈতিক তৎপরতা ও উত্তেজনা প্রশমনের উদ্যোগ। হরমুজ প্রণালি কেবল একটি জলপথ নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির স্পন্দন। সামরিক উত্তেজনা যদি অব্যাহত থাকে, তার অভিঘাত সীমান্ত ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বাড়াবে। অতএব সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল আচরণ ও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতার মাধ্যমেই এই সংকটের টেকসই সমাধান সম্ভব।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে