ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছেলে মুজতবা হোসেইনি খামেনি। দেশটির ধর্মীয় পরিষদ অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস তাকে এই পদে নির্বাচিত করেছে। নতুন নেতা ঘোষণার পর ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস আইআরজিসি এবং দেশটির সশস্ত্র বাহিনী তার প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছে।
রয়টার্স, আল জাজিরা ও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান জানিয়েছে, রোববার (৯ মার্চ) তেহরান সময় মধ্যরাতের পর ৮৮ সদস্যের অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস এক বিবৃতিতে মুজতবা খামেনিকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের তৃতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচনের ঘোষণা দেয়। এই পদ তাকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে।
এর আগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। ওই হামলায় তার স্ত্রী, মুজতবা খামেনির স্ত্রী এবং এক বোনও নিহত হন। হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকায় মুজতবা খামেনি প্রাণে বেঁচে যান।
নতুন নেতা নির্বাচনের পর ইরানের প্রভাবশালী সামরিক বাহিনী আইআরজিসি এক বিবৃতিতে মুজতবা খামেনিকে অভিনন্দন জানিয়ে তার প্রতি “আন্তরিক ও আজীবন আনুগত্য” ঘোষণা করেছে। বিবৃতিতে বলা হয়, বাহিনীটি তার সব নির্দেশ মেনে চলবে এবং তা বাস্তবায়নে সব সময় প্রস্তুত থাকবে। তারা আরও বলেছে, বিশেষজ্ঞ পরিষদের এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করেছে যে ইসলামি বিপ্লব কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয় এবং এর অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে।
পরে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীও নতুন নেতার প্রতি সমর্থন জানায়। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে মুজতবা খামেনিকে “ন্যায়পরায়ণ, জ্ঞানী, ধর্মপ্রাণ ও বিচক্ষণ” নেতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। একই সঙ্গে বলা হয়, তাকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ পরিষদ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে।
ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, “শত্রুরা ভেবেছিল আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর ইরান অচল হয়ে পড়বে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ পরিষদ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নতুন নেতা নির্বাচন করেছে।”
৫৬ বছর বয়সী মুজতবা খামেনিকে দীর্ঘদিন ধরেই তার বাবার সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। তবে তিনি কখনো কোনো সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করেননি এবং বেশিরভাগ সময়ই জনসম্মুখের বাইরে থেকেছেন। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি তেহরানের আলাভি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন এবং পরে ধর্মীয় শিক্ষা নিতে কুম শহরে যান, যা শিয়া ধর্মতত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
বিশ্লেষকদের মতে, মুজতবা খামেনির সঙ্গে আইআরজিসির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং ইরানের ক্ষমতার কাঠামোতে তার প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। তবে তার ক্ষমতায় আসা নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমতও রয়েছে। সমালোচকদের কেউ কেউ বলছেন, বংশানুক্রমিকভাবে সর্বোচ্চ নেতার পদ হস্তান্তর করা হলে তা ইসলামী বিপ্লবের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
নতুন নেতা নির্বাচনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও মন্তব্য করেছেন। এবিসি নিউজকে তিনি বলেন, “খামেনির ছেলে আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।” তিনি আরও বলেন, নতুন নেতা যদি যুক্তরাষ্ট্রের অনুমোদন না পান, তবে তিনি দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না।
এদিকে ইসরায়েলও আগেই সতর্ক করে বলেছে, ইরানের নতুন যে নেতা-ই নির্বাচিত হোক না কেন, তাকে লক্ষ্য করে অভিযান চালানো হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও সামরিক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।