দেশের রপ্তানিতে টানা মন্দাভাব চলছে। নেতিবাচক ধারা থেকে দেশের পণ্য রপ্তানি বেরোতে পারছে না। গত ফেব্রুয়ারিতে টানা সপ্তম মাসের মতো কমেছে রপ্তানি। টানা ৭ মাস রপ্তানি কমায় চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) দেশের ৩ দশমিক ১৫ শতাংশ সামগ্রিক পণ্য রপ্তানি কমেছে। ওই সময়ে ৩ হাজার ১৯১ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। যা দেশীয় মুদ্রায় ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৬৭৯ কোটি টাকার সমান। দেশ থেকে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল এবং চামড়াবিহীন জুতা রপ্তানি কমেছে। তবে প্রকৌশল পণ্য ও প্লাস্টিক পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। কিন্তু বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতে দেশের পণ্য রপ্তানি নিয়ে নতুন শঙ্কা বাড়ছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও রপ্তানি নতুন করে সংকটে পড়বে। ইতিমধ্যে কিছু পণ্য রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হতে শুরু হয়েছে। রপ্তানিকারক এবং রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের মোট পণ্য রপ্তানিতে তৈরি পোশাকই সিংহভাগ। চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসের মধ্যে গত ফেব্রুয়ারিতে সবচেয়ে কম তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। ওই মাসে মাত্র ২৮২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। যদিও বাকি মাসগুলোতে রপ্তানি হয়েছে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি তৈরি পোশাক। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ২ হাজার ৫৮০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়। ওই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কম। তাছাড়া দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি খাত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিও কমেছে। গত মাসে ৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। ওই রপ্তানি তার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ কম। সামগ্রিকভাবে চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ৭৯ কোটি ডলারের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে। যদিও ওই রপ্তানি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি।
সূত্র জানায়, দেশের রপ্তানি আয়ের প্রাণশক্তি তৈরি পোশাক খাতের আয় ফেব্রুয়ারিতে ১৩ দশমিক ২১ শতাংশ কমে ২ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অথচ গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছর ২০২৫-২৬ সালের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সময়কালে তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি আয় ৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ২৫ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, যা আগের বছর ছিল ২৬ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন ডলার। গত আগস্টে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ, সেপ্টেম্বরে আগের মাসের থেকেও বেশি কমেছে অর্থাৎ ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অক্টোবরে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশ। নভেম্বরে কমেছে ৫ শতাংশ। ডিসেম্বরে কমেছে ১৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। জানুয়ারিতে ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতে ওভেন পোশাক রপ্তানি কমেছে ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ আর নিট পোশাক রপ্তানি কমেছে ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অথচ গত অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে ১৫৯ কোটি ডলারের ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে। আর চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে ১৪১ কোটি ডলারের রপ্তানি হয়েছে। আর নিট পোশাক গত অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে ১৬৫ কোটি ডলারের রপ্তানি হয়েছে। আর অর্থবছরে ১৩৯ কোটি ডলারের রপ্তানি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ফেব্রুয়ারি সাত মাসে ১৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ডলারের নিটওয়্যার পোশাক রপ্তানি হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪ দশমিক ৫৬ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মাসে ১২ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলারের ওভেন পোশাক রপ্তানি হয়েছে। যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৭৯ শতাংশ কম।
এদিকে এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানান, কয়েক মাস ধরে দেশের রপ্তানি আয় কমছে। আর আগামী জুন পর্যন্ত কমতে পারে। তবে জুনের পর বাড়বে কিনা সেটাও বলা যাচ্ছে না। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী মন্দা চলছে। দেশের বড় সংকট হলো ব্যাংকিং খাত। ব্যাংকিং সংকট আমদানি-রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একটার পর একটা কারখানা বন্ধ হওয়ার মূল কারণ ব্যাংকিং সমস্যা। বাংলাদেশ ব্যাংকের গত দেড়-দুই বছরের ভুল নীতির কারণে একটার পর একটা কারখানা বন্ধ হয়েছে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল জানান, ইউরোপ-আমেরিকা দুই জায়গাতেই পোশাক রপ্তানি কমছে। মোট রপ্তানিতে এটার প্রভাব পড়ছে। অপ্রচলিত বাজারেও ভালো করা যায়নি। তাছাড়া ফেব্রুয়ারি দেশে নির্বাচনের মাস ছিল। তাছাড়া বন্দর বন্ধ ছিল। সেজন্য বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। টোটাল রপ্তানি কমছে। এখন আবার ইরান যুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিশ্বব্যাপী এর প্রভাব পড়বে। সামনে কী প্রভাব পড়বে তা এখন দেখার বিষয়।