রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন বাস্তবতায় যাত্রা শুরু করল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বেলা ১১টা ৫ মিনিটে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনটি নানা দিক থেকে ব্যতিক্রমী, কারণ স্পিকারের আসন ফাঁকা রেখেই শুরু হয়েছে নতুন সংসদের কার্যক্রম।
সংসদীয় রীতিতে সাধারণত বিদায়ী স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় এবং তাদের তত্ত্বাবধানে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। দ্বাদশ সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করার পর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। আর বিদায়ী ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। ফলে স্পিকারের আসন শূন্য রেখেই অধিবেশন শুরু হয়।
সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদ নির্বাচনের ফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হয়। সেই বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৩ ফেব্রুয়ারি অধিবেশন আহ্বান করেন। প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়। সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই গঠিত হয়েছে বর্তমান সংসদ। নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করে, যার মধ্যে বিএনপি একাই পেয়েছে ২০৯টি আসন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৬টি আসন, যার মধ্যে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে পেয়েছে ৬৮টি আসন।
নতুন সংসদে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে সংসদ নেতা নির্বাচিত করা হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতা হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
অধিবেশনের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের পর বেলা সোয়া ১১টার কিছু আগে বক্তব্য শুরু করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি ১৯৭১ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্দোলন ও সংগ্রামে নিহত সব শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি জানিয়েছেন, অধিবেশনের শুরুতে সংসদ নেতা একজন জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যের নাম প্রস্তাব করবেন। অন্য একজন সদস্য তা সমর্থন করলে ওই সদস্যের সভাপতিত্বেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে। একাধিক প্রার্থী না থাকলে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে তাদের নির্বাচন করা হতে পারে।
নির্বাচনের পর স্বল্প সময়ের জন্য অধিবেশন মুলতবি থাকবে। ওই সময় সংসদ ভবনেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন। এরপর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে সংসদের মূল কার্যক্রম শুরু হবে।
অধিবেশনের প্রথম বৈঠকে সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন, শোক প্রস্তাব উত্থাপন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা প্রায় ১৩০টি অধ্যাদেশ সংসদে উপস্থাপনের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। এসব অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
এদিকে অধিবেশন ঘিরে জাতীয় সংসদ ভবন ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকাল ৭টা থেকেই সংসদ এলাকা ও আশপাশের সড়কে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সংসদ ভবনের বিভিন্ন গেটে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নেন এবং প্রবেশপথে কঠোর তল্লাশি চালানো হয়।
নিরাপত্তার অংশ হিসেবে ফার্মগেটের খামারবাড়ি মোড় থেকে মিরপুরমুখী সড়ক বন্ধ রাখা হয়। বিজয় সরণি মেট্রো স্টেশন থেকে ফার্মগেটমুখী সড়কে যান চলাচলও সীমিত করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই সংসদ বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। সরকারি ও বিরোধী দল মিলিয়ে সংসদের প্রায় ৭৬ শতাংশ সদস্যই নতুন হওয়ায় সংসদীয় কার্যক্রমে নতুন অভিজ্ঞতার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।