মামলার নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার কারণে দেশের দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দমন করা প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশন -দুদকের দায়ের করা মামলাগুলো বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। বর্তমানে প্রায় বারো হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার মধ্যে অধিকাংশই অর্থপাচার, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, আয়কর ফাঁকি, সম্পদের তথ্য গোপন, ঘুষ গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ক্রয় প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে দায়ের করা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা। মামলার সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু নিষ্পত্তির হার অত্যন্ত কম, ফলে বছর শেষে নতুন মামলা যুক্ত হয়ে মামলাজট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। দুদক ও আদালত সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় বারো হাজার। এর মধ্যে অধস্তন বা বিচারিক আদালতে রয়েছে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার, হাইকোর্টে চার হাজার এবং আপিল বিভাগে প্রায় হাজারখানেকট মামলা। এছাড়া উচ্চ আদালতের আদেশে চারশতাধিক মামলা স্থগিত রয়েছে। মামলাগুলোর নিষ্পত্তি না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো অভিযুক্তদের আইনি প্রতিকার চাওয়ার প্রবণতা। তারা বিচারিক আদালতের পাশাপাশি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করে মামলার কার্যক্রম দীর্ঘায়িত করে। অনেক ক্ষেত্রে দুদকের নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট আবেদন করা হয়, ফলে মামলার কার্যক্রম থেমে যায়। জানা যায়, দুদকের হয়ে মামলা পরিচালনার জন্য ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩৫ জন আইনজীবীর একটি প্যানেল ছিল। কিন্তু কাজের মান ও উপস্থিতির ঘাটতির কারণে নতুন প্যানেল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার পরিবর্তনের কারণে সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়। ২০২৬ সালের মার্চে দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করায় কমিশন নেতৃত্বশূন্য অবস্থায় পড়ে। এর আগে সুপ্রিম কোর্টে মামলা পরিচালনার জন্য আইনজীবী ড. শাহদীন মালিককে কেইস-টু-কেইস ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়। তার সঙ্গে অস্থায়ীভাবে আরও ৫৩ জন আইনজীবী কাজ করছেন। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি মাসের তথ্য অনুযায়ী, বিচারিক আদালতে ঢাকায় ৮৬৫টি এবং ঢাকার বাইরে ২৯৩৯টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এছাড়া ২৪৮টি মামলা উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত আছে। চলতি সময়ে সারাদেশে মাত্র ৩৩টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। অবাক করা তথ্য হলো, ২২ বছর আগে বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর আমলের ৩৩৫টি মামলা এখনও নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে এখনও পর্যন্ত মাত্র একটি নিষ্পত্তি হয়েছে। দুদক কর্মকর্তারা জানান, চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে থাকা ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে থাকা ২ হাজার ২১৬ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ১ হাজার ৮৪৬ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়। দুদক বলছে, তাদের মামলাগুলোতে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রের অনুকূলে অর্থ আদায় একটি ইতিবাচক দিক। তবে বিচারাধীন মামলার বিষয়টি আদালতের এখতিয়ারে। দুদকের প্রসিকিউশন টিম মামলার নিষ্পত্তিতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। কেন মামলাজট বাড়ছে- এ বিষয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, আদালতের স্থগিতাদেশ, বিচারক সংকট এবং প্রশাসনিক জটিলতা প্রধান কারণ। বিচারক সংকটের কারণে মামলার শুনানি বিলম্বিত হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৯৪ হাজার মানুষের বিপরীতে একজন বিচারক রয়েছেন, যা উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। ফলে মামলার চাপ সামলাতে গিয়ে বিচারকরা সময়মতো শুনানি শেষ করতে পারছেন না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুদকের মামলাজট শুধু বিচারব্যবস্থার সংকট নয়, বরং দুর্নীতিবাজদের জন্য সুবিধাজনক হয়ে উঠছে। তারা বছরের পর বছর বিচার এড়িয়ে যেতে পারছে। সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল হচ্ছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, কারণ দুর্নীতি দমন কার্যকর না হলে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন ব্যাহত হয়। সমাধানের উদ্যোগ হিসেবে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, মামলাজট ও নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা নিরসনে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সুপ্রিম জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল অর্ডিন্যান্স-২০২৫ প্রণয়ন করে বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছতা আনা হয়েছে। বিচার বিভাগের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ইউএনডিপি’র সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সেমিনার ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুদকের মামলাজট বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিচারক নিয়োগ বৃদ্ধি, তদন্ত প্রক্রিয়া দ্রুততর করা এবং আদালতের স্থগিতাদেশ কমানো ছাড়া এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। দুর্নীতি দমন কার্যকর না হলে অর্থনীতি ও সমাজ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।