ভোরের আলো ফুটতেই সিলেট শহর যেন জেগে ওঠে এক নতুন সুরে, নতুন রঙে। পহেলা বৈশাখ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব, আর সেই উৎসবকে ঘিরে সিলেটজুড়ে তৈরি হয় এক অনন্য আবহ। যেখানে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর মানুষের উচ্ছ্বাস মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ জড়ো হতে থাকে উৎসবমুখর আয়োজনে। সিলেট সার্কিট হাউস প্রাঙ্গণে জাতীয় সংগীতের সুরে শুরু হয় দিনের আনুষ্ঠানিকতা। এরপর রঙিন ব্যানার, মুখোশ আর লোকজ উপকরণে সাজানো বৈশাখী শোভাযাত্রা এগিয়ে চলে নগরীর প্রাণকেন্দ্র চৌহাট্টার দিকে। শিশু থেকে প্রবীণ। সব বয়সী মানুষের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা হয়ে ওঠে এক চলমান উৎসবচিত্র।
শহরের কিনব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় বসা বৈশাখী মেলায় যেন গ্রামীণ বাংলার প্রতিচ্ছবি। মাটির তৈরি পণ্য, হাতে বানানো অলংকার, পিঠা-পুলি আর নানা লোকজ সামগ্রী ঘিরে মানুষের ভিড়-সব মিলিয়ে এখানে ধরা পড়ে বাংলার শেকড়ের টান। পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের মুখে হাসি, শিশুদের উচ্ছ্বাস। সবই নববর্ষের আনন্দকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও উৎসবের আমেজ কম নয়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে রঙিন শোভাযাত্রা আর শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ নতুন বছরকে স্বাগত জানায় এক ভিন্ন মাত্রায়। হাতি, দোয়েল, ইলিশ কিংবা পালকির প্রতীকী উপস্থাপন যেন বাঙালির ঐতিহ্যকে নতুন করে মনে করিয়ে দেয়। একইভাবে এমসি কলেজ ক্যাম্পাসেও গান, নাচ, নাটক আর আবৃত্তির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তারুণ্যের উচ্ছ্বাস।
সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও নববর্ষকে ঘিরে ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। শ্রীহট্ট সংস্কৃত কলেজ প্রাঙ্গণ, ব্লু বার্ড স্কুল মাঠ কিংবা ভোলানন্দ নৈশ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ। সবখানেই চলছে দিনব্যাপী অনুষ্ঠান। লোকসংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি আর নাটকের পরিবেশনায় ফুটে উঠছে বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি।
জিন্দাবাজারের হাছন রাজা জাদুঘরেও চলছে বৈশাখী আয়োজন। লোকগানের সুর আর আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে এখানে তুলে ধরা হচ্ছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক ধারা। অন্যদিকে শিল্পপ্রেমীদের জন্য কুমারপাড়ার আর্ট কলেজে আয়োজন করা হয়েছে চিত্র প্রদর্শনী, যেখানে রঙ-তুলিতে ধরা পড়ছে নববর্ষের আবেগ ও সৌন্দর্য।
উৎসবকে ঘিরে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নগরজুড়ে সক্রিয় রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। যা এই উৎসবকে করে তোলে সত্যিকার অর্থেই সর্বজনীন।
দিনশেষে বলা যায়, পহেলা বৈশাখ শুধু একটি দিন নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতিচ্ছবি। আর সেই পরিচয়কে বুকে ধারণ করে সিলেটবাসী আবারও বরণ করে নেয় নতুন বছরকে। আনন্দে, ঐতিহ্যে আর এক অপার ভালোবাসায়।