সিলেটের আধ্যাত্মিক প্রাণকেন্দ্র হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহ আজ যেন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার এক মোহময় মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
বুধবার (১৫ এপ্রিল) দরগাহে পালিত হলো ঐতিহ্যবাহী ‘লাকড়ি তোরা’ উৎসব, যা হিজরি সন অনুযায়ী জিলকদ মাসের ১৯ ও ২০ তারিখে দুই দিনব্যাপী ওরস মোবারক অনুষ্ঠিত হয়। এবারও ৭০৭তম ওরস মোবারকের অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয় এই লাকড়ি তোরা উৎসব।
এই উৎসব শুধুই কাঠ বহনের অনুষ্ঠান নয়; এটি শ্রমের মর্যাদা, সামাজিক সাম্য এবং মানুষে মানুষে সকল ভেদাভেদ ভুলে একত্র হওয়ার এক গৌরবময় প্রতীক।
শতাব্দী পেরোনো এক উৎসবের শিকড় কোথায়?
‘লাকড়ি তোরা’ উৎসবের শিকড় গিয়ে মিশেছে সেই ১৩০৩ সালে, যখন হযরত শাহজালাল (রহ.) সিলেট বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দেন এই অঞ্চলে। এই বিজয়ের স্মরণেই প্রতিবছর শাওয়াল মাসের ২৬ তারিখে এই উৎসব পালিত হয়, যা এক সময় ‘সিলেট বিজয় দিবস’ নামেও পরিচিত ছিল।
তবে এই উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও একটি মানবিক অধ্যায়। জনশ্রুতি মতে, এক দরিদ্র কাঠুরে তার কন্যাদের বিয়ে নিয়ে হযরত শাহজালালের (রহ.) কাছে অভিযোগ করেন। কারণ, সমাজ তাকে 'নিচু পেশার মানুষ' হিসেবে দেখে। তখন শাহজালাল (রহ.) নিজ হাতে কুড়াল তুলে কাঠ কাটতে যান এবং তার অনুসারীদের সঙ্গে নিয়ে সমাজকে শেখান শ্রম লজ্জার নয়, গৌরবের; আর মানুষ শুধু পেশা দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই শিক্ষাই শত শত বছর পরও জীবন্ত রয়েছে ‘লাকড়ি তোরা’র মাধ্যমে।
আজকের আয়োজন: ঐতিহ্য আর আত্মার মিলন
বুধবার, ১৫ এপ্রিল, জোহরের নামাজের পর থেকেই দরগাহ প্রাঙ্গণ মুখর হয়ে ওঠে হাজারো ধর্মপ্রাণ মানুষের পদচারণায়। “হাতে দা-কুঠার, মুখে ‘লালে লাল, বাবা শাহজালাল’ এমন স্লোগানে মুখর হয়ে ভক্তরা মিছিল সহকারে রওনা হন লাক্কাতুরা চা-বাগানের দিকে। লাক্কাতুরা বাগানে মিলাদ ও দোয়া শেষে সেখান থেকে সংগ্রহ করা লাকড়ি নিয়ে এসে দরগাহ সংলগ্ন পুকুরে ধুয়ে নির্ধারিত স্থানে সযত্নে রাখা হয়। এই কাঠ ওরসের রান্না ও শিরনীর প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হত। তবে, বর্তমানে প্রতীকী হিসেবেই লাকড়ি সংগ্রহ হয়ে থাকে।
দরগাহ কমিটির পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারী ভক্তদের মাঝে বিতরণ করা হয় বিশেষ শিরনী। শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই সারিবদ্ধভাবে শিরনী গ্রহণ করেন এবং একত্রিত হন বিশেষ দোয়া মোনাজাতে।
শ্রম আর সংহতির প্রতীক:
এই উৎসব কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এটি এক ব্যতিক্রমধর্মী সামাজিক বার্তা। “এটা শুধু কাঠ বহন নয়, এটা ভালোবাসার বহন”বলছিলেন এক বৃদ্ধ ভক্ত, যিনি ২৬ বছর ধরে এই আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন। এখানে ধনী-গরিব, নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত সবার অবস্থান এক সারিতে। সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অংশ নেন একটি পবিত্র প্রয়াসে।
হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর শিক্ষা "সমাজে কোনো পেশা ছোট নয়, প্রত্যেকেই সম্মানের দাবিদার" এই উৎসবে এসে যেন বাস্তবে রূপ নেয়।
প্রশাসন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা:
ওরস উপলক্ষে দরগাহ ও আশপাশের এলাকায় নেয়া হয়েছে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রশাসনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবকরাও সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন ভক্তদের নিরাপত্তা ও সেবার জন্য। আয়োজকদের মতে, এবারের ওরসে দেশ-বিদেশ থেকে আগত ভক্তদের উপস্থিতি বিগত বছরের তুলনায় অনেক বেশি।
এক উৎসবে বহু অর্থ:
‘লাকড়ি তোরা’ উৎসব কেবল ঐতিহ্য নয়। এটি একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত। নতুন প্রজন্মের জন্য এটি শিক্ষার এক উন্মুক্ত পাঠশালা, যেখানে শেখানো হয় পরিশ্রমের মর্যাদা, সাম্যের চেতনা এবং আধ্যাত্মিক ঐক্যের মহিমা। হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর জীবনদর্শনের ছায়া পড়েছে এই উৎসবে, আর এই উৎসব হয়ে উঠেছে সিলেটের প্রাণ, বাংলাদেশের আত্মার প্রতীক।