ডুবে গেছে হাজার হাজার একর ধান, দিশেহারা কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪১ এএম
ডুবে গেছে হাজার হাজার একর ধান, দিশেহারা কৃষক

অতিবৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে একের পর এক বোরো ধানক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও খাগড়াছড়িসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়ে যাওয়ায় লাখো কৃষক এখন দিশেহারা। চোখের সামনে বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে অনেকেই ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে টানা বৃষ্টিতে ইতোমধ্যে বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অষ্টগ্রাম হাওরের কৃষক কামরুল ইসলাম বলেন, “পাকা ধান কাটতে পারি নাই শ্রমিকের অভাবে। অল্প কিছু কেটেছি, বাকিটা পানির নিচে চলে গেলো। মনে হয় না আর রক্ষা করতে পারমু।” জেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে গেছে। তবে কৃষকদের দাবি, ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।

নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। পূর্বাভাস বলছে, আরও কয়েকদিন এমন বৃষ্টি চলতে পারে। এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সুনামগঞ্জেও একই চিত্র। জেলার ২০টির বেশি হাওরে অন্তত ১০ হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের ভাষ্য, গত দুই দিনের অতিবৃষ্টি ও উজানের ঢলে এই বিপর্যয় নেমে এসেছে। অনেক জায়গায় বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়েছে। শাল্লা ও তাহিরপুরের কৃষকদের একজন বলেন, “জমির ধান তো গেছেই, খলায় রাখা ধানও নষ্ট হয়ে গেছে।” কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, জেলার মাত্র ৪৪ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে, বাকিটা এখন ঝুঁকিতে।

নেত্রকোনায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। মঙ্গলবার (২৯ এপ্রিল) সকাল ৯টা থেকে বুধবার (৩০ এপ্রিল) সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৩২ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে। কংস নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার বিভিন্ন হাওরের অন্তত অর্ধেক ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। কৃষক আসাদুল্লাহ রিয়াদ বলেন, “পাঁচ একর জমির ধান তলিয়ে গেছে। যেটুকু আছে, সেটাও কাটতে পারছি না।”

হবিগঞ্জে চার উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার একর জমির ধান তলিয়ে গেছে। মৌলভীবাজারে অন্তত এক হাজার হেক্টর জমির ধান পানির নিচে। একইভাবে খাগড়াছড়িতে ২২১ হেক্টর ধানসহ সবজি ও ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক কৃষক জানিয়েছেন, ঋণ করে চাষ করা ফসল হারিয়ে তারা এখন চরম দুশ্চিন্তায়।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আগাম সতর্কতা হিসেবে ধান দ্রুত কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু টানা বৃষ্টি, শ্রমিক সংকট এবং হাওরে জমে থাকা পানির কারণে অনেক ক্ষেতেই তা সম্ভব হয়নি। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, “বৈরী আবহাওয়া আর পাহাড়ি ঢলের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তবুও কৃষকদের পাশে থাকার চেষ্টা করা হচ্ছে।”

এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর সতর্ক করে জানিয়েছে, ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে আরও কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত বাড়ায় ঢলের চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, বাস্তব ক্ষতির তুলনায় সরকারি হিসাব কম দেখানো হচ্ছে। হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা বলছেন, অনেক হাওরের অর্ধেকের বেশি ধান ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। এক কৃষকের কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট, “চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেলো, কিছুই করতে পারলাম না।”

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে