ভাটি এলাকার সিংহদ্বার বলে খ্যাত কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর রেল স্টেশন ও উপজেলার সরারচর রেল স্টেশন দুটি বছরের পর বছর ধরে নানান সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। ফলে প্রতিদিন শত-শত যাত্রী ও রোগীদের দুর্ভোগ ও বিড়ম্বনা পোহাতে হচ্ছে। এসব দেখার যেন কেউ নেই। এগারো সিন্ধুর ও কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেসের প্রথম শ্রেণির ও এসি কোচগুলোতে টিকিটবিহীন যাত্রীর সংখ্যা বেশি। ফলে টিকিটধারী যাত্রীরা সিটে বসে নড়াচড়া কিংবা প্রয়োজনে বাথরুমেও যেতে পারেন না। দায়িত্বরত অ্যাটেনডেন্ট ও নিরাপত্তা কর্মীদেরও ডেকে পাওয়া যায় না বলে একাধিক যাত্রী অভিযোগ করেছেন। বিশেষ করে ভৈরব, নরসিংদী ও বিমানবন্দর স্টেশন থেকে প্রথম শ্রেণি ও এসি কোচগুলোতে স্ট্যান্ডিং ও টিকিটবিহীন যাত্রীরা ট্রেনে উঠে ভিড় করেন। সরারচর বি-শ্রেণির স্টেশনটি স্থাপিত হয় ১৮১৭ সালে। এ স্টেশনে জন্মলগ্ন থেকেই নেই প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগার। দ্বিতীয় শ্রেণির একটি বিশ্রামাগার থাকলেও বসার চেয়ার-বেন্চ ভাঙা হওয়ায় যাত্রীরা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও চায়ের দোকানে বসে ট্রেনের অপেক্ষা করেন। অধিকাংশ সময় বিশ্রামাগারটি বন্ধ থাকে। স্টেশন মাস্টারের রুমসহ আরও দুটি কক্ষে ফাটল দেখা দিয়েছে। স্টাফদের সরকারি বাসা না থাকায় তাঁরা বাইরে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকেন। এ স্টেশনে ১২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মাত্র ১০ জন কর্মরত আছেন। এগারো সিন্ধুর ও কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন দুটির জন্য টিকিটের চাহিদা ৭০০ হলেও বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৩৫৬টি। ফলে যাত্রীরা বাধ্য হয়ে স্ট্যান্ডিং টিকিট নিয়ে দাঁড়িয়ে ঢাকা যাতায়াত করছেন।
আগে ইশা-খাঁ এক্সপ্রেস ও দুটি লোকাল ট্রেন চলাচল করত। এগুলো প্রায় তিন বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ভাঙা ও নিচু হওয়ায় যাত্রীদের ওঠানামায় সমস্যা হয়। রোগী ও বয়স্কদের জন্য হুইলচেয়ার ব্যবহারও করা যায় না। এসব স্টেশন থেকে প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থানে শত-শত যাত্রী যাতায়াত করেন। সরারচর স্টেশনে দুই বছর আগে মাসে গড়ে ২০ লাখ টাকা আয় হতো। ইশা-খাঁ এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বর্তমানে মাসে গড়ে ১৩ লাখ টাকা আয় হয়। স্টেশনের সকল সমস্যার বিষয় রেল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে বলে সরারচর স্টেশন মাস্টার রথিশ বিশ্বাস জানান। বাজিতপুর রেল স্টেশনটি স্থাপিত হয় ১৯৭৬ সালের ১ জুন। এই স্টেশনে জন্মলগ্ন থেকেই ৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্থলে দীর্ঘদিন মাত্র ২ জন কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি একজন যোগদান করলেও তিনি মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রয়েছেন।
এখানে প্রথম শ্রেণির বিশ্রামাগার নেই। দ্বিতীয় শ্রেণির বিশ্রামাগার থাকলেও বসার পর্যাপ্ত চেয়ার না থাকায় যাত্রীরা চায়ের দোকান ও প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে কিংবা বসে ট্রেনের অপেক্ষা করেন। এ স্টেশন থেকে ঢাকা যাওয়ার জন্য এগারো সিন্ধুর ও কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিটের চাহিদা ৪০০ হলেও বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১৩২টি। এ স্টেশনের সন্নিকটে রয়েছে জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নার্সিং ইনস্টিটিউট, আফতাব বহুমুখী ফার্ম, সরকারি-বেসরকারি অফিস ও চৌকি আদালত। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, মেডিকেলের ডাক্তার, ছাত্র-ছাত্রী ও ব্যবসায়ীরা এ স্টেশন থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করেন। এ স্টেশন থেকে আগে মাসে ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকা আয় হতো। ইশা-খাঁ এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে মাসে আয় হয় প্রায় ৫ লাখ টাকা। রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী কোনো ডি শ্রেণির স্টেশনে মাসে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় হলে সেটিকে বি শ্রেণিতে উন্নীত করার বিধান থাকলেও বাজিতপুর স্টেশনটি দীর্ঘ ৫০ বছরেও কোনো উন্নতি পায়নি। বাজিতপুর স্টেশনের সমস্যাগুলোর বিষয়ে লিখিতভাবে রেল বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে বাজিতপুর স্টেশনের ইনচার্জ নাজমুল হক এ প্রতিবেদককে জানান। এছাড়া ভৈরব থেকে কিশোরগঞ্জ লাইনে ট্রেন চলাকালে ট্রেন লাফাতে থাকে। এতে অনেক যাত্রী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। জানা গেছে, স্লিপার পুরোনো ও পাথর কম থাকায় এমনটি হচ্ছে। রোববার (২৬ এপ্রিল) রেলওয়ে ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ হাসান হাবীবের কাছে ট্রেন লাফানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ট্রেনচালকদের আগেই বলে দেওয়া হয়েছে, ৫০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে যেন ট্রেন না চালানো হয়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অন্য জায়গায় প্রকল্পের কাজ চলছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ভৈরব থেকে কিশোরগঞ্জ হয়ে আঠারোবাড়ি স্টেশন পর্যন্ত লাইনের কাজ শুরু হবে। কাজ সম্পন্ন হলেই ট্রেন লাফানো বন্ধ হবে। তখন ৬০ কিলোমিটার গতি হলেও কোনো সমস্যা হবে না। বাজিতপুর ও সরারচর রেল স্টেশনের সমস্যার সমাধান বিষয়ে জানতে রোববার (২৬ এপ্রিল) ঢাকা রেলওয়ে বিভাগের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) মো. মহব্বতজান চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিশ্রামাগারের চেয়ার দ্রুত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও জানান, ইঞ্জিন স্বল্পতার কারণে ইশা-খাঁ এক্সপ্রেস ও লোকাল ট্রেন বন্ধ করা হয়েছে। প্ল্যাটফর্ম ও স্টেশন মাস্টারের রুমে ফাটলের বিষয়ে প্রকৌশল বিভাগকে জানানো হবে। টিকিটসহ অন্যান্য সমস্যাগুলোও পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে।