পানির নিচে কৃষকের সোনালি স্বপ্ন

অপরিকল্পিত বাঁধে ডুবছে সুনামগঞ্জের হাওর

এফএনএস (একে কুদরত পাশা; দিরাই, সুনামগঞ্জ) : | প্রকাশ: ২ মে, ২০২৬, ০৮:০৭ পিএম
অপরিকল্পিত বাঁধে ডুবছে সুনামগঞ্জের হাওর

সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য দুঃসংবাদ দিয়েই শুরু হয়েছে শনিবার। সকালে পাউবোর নির্মিত বাঁধ ভেঙে মধ্যনগরের বোয়ালমারা হাওরে পানি ঢ়ুকে পড়ায় তলিয়ে যেতে শুরু করেছে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান। সদর উপজেলার মোহনপুর ও গৌরারং ইউনিয়নের জোয়ালভাঙ্গা হাওরে গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। নৌকাখালী থেকে আবুল মিয়ার খলা পর্যন্ত অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত একটি বাঁধের কারণে হাওরটি যেন পুকুরে পরিণত হয়েছে। মাঝখানে বাঁধ থাকায় পানি আটকে গিয়ে একাংশে জমে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। পানির নিচে ঝলমল করছে পাকা ধান, কিন্তু তা কাটতে পারছেন না কৃষকরা।

পানির তীব্র ঠান্ডার কারণে কৃষকরা ১০ মিনিটের বেশি পানিতে থাকতে পারছেন না। আবার অনেকের নৌকা না থাকায় ক্ষেতে পৌঁছানোও সম্ভব হচ্ছে না। কেউ কেউ গলাপানিতে নেমে ধান কেটে পলিথিনে করে উঁচু জায়গায় তুলছেন, তবুও বেশিরভাগ ফসল রক্ষা করা যাচ্ছে না। 

রহমতপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল মুকিদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ধান রক্ষার জন্য যে বাঁধ দেওয়া হয়েছিল, সেটিই এখন তাদের জন্য “গলার কাঁটা”হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুরু থেকেই তারা এ স্থানে বাঁধ না দেওয়ার কথা বলেছিলেন, কিন্তু তা শোনা হয়নি। ফলে বাঁধের কারণেই তাদের সব জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি জানান, ৩০ কেদার জমিতে ধান চাষ করলেও এক মুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। এখন আর পানির নিচ থেকে ধান কাটার চেষ্টাও করবেন না বলে জানান তিনি। পাশাপাশি অন্য কৃষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “যেভাবে পারেন ধান কেটে নিন।” একই এলাকার কৃষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, ১০ কেয়ার জমিতে ধান চাষ করেছিলেন, কিন্তু ধান পাকতেই তা পানিতে ডুবে যায়। ছোট ভাইকে নিয়ে কিছু ধান কাটার চেষ্টা করতে মাঠে নামলেও পানির তীব্র ঠান্ডা সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “এ অবস্থায় সংসার কীভাবে চলবে, আর ছোট ভাই-বোনদের পড়ালেখার খরচ কীভাবে চালাবো-তা বুঝতে পারছি না।”

রহমতপুর গ্রামের রুবেল নৌকায় করে ধান আনার সময় সাংবাদিকদের হাওরের ভেতরে নিয়ে গিয়ে পানির নিচে ডুবে থাকা সোনালি ফসল দেখান। তার অভিযোগ, অপরিকল্পিত বাঁধের কারণেই এই ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, হাওরে বাঁধ না দিলে তাদের জমি এভাবে ডুবে যেত না।

এদিকে কাশেম, এবাদুর ও কামালসহ কয়েকজন কৃষক জানান, পানির ঠান্ডা এতটাই তীব্র যে শরীরে সহ্য করা যাচ্ছে না। তবুও পরিবারের কথা ভেবে পানিতে নেমে ধান কাটতে হচ্ছে। তারা বলেন, “এই ধানই আমাদের সবকিছু। ধান তুলতে না পারলে আমরা খাবো কী?”তাদের মতে, বাঁধের কারণে এ এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কারণ ধান পাকলে কাটার অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। কিন্তু আকস্মিক বৃষ্টিতে আধাপাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চেয়ারম্যান প্রার্থী মছিহুর রহমান রাসেল বলেন, হাওরের পানির ঢেউ যেন কৃষকের বুকে দুঃখের আঘাত হয়ে এসেছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা দেওয়ায় পানি বের হতে পারেনি, ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে ফসল তলিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, হাওরের ধানই কৃষকদের বছরের একমাত্র ভরসা-এই ধানকে কেন্দ্র করেই তাদের সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা, বিয়ে ও অন্যান্য প্রয়োজন নির্ধারিত হয়। কিন্তু ধান পাকার আগেই তা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এবার তারা কীভাবে চলবেন, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

জেলা কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর সুনামগঞ্জে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ ধান কাটা শেষ হলেও উঁচু এলাকার অধিকাংশ ধান এখনো মাঠে রয়েছে। পানি বাড়তে থাকলে বাকি ফসল ঘরে তোলা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, “ধান কাটার সময় প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে সময় বাঁধ ভেঙেছে, তাই তাৎক্ষণিকভাবে বাঁধ রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।” একটির পর একটি বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি প্রবেশ করায় সুনামগঞ্জের কৃষকদের চোখে এখন হতাশা আর অনিশ্চয়তার ছায়া।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে