হাওরে রোদের ঝিলিক, ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রামে কৃষকরা

এফএনএস (একে কুদরত পাশা; দিরাই, সুনামগঞ্জ) : | প্রকাশ: ৩ মে, ২০২৬, ০৭:৪৬ পিএম
হাওরে রোদের ঝিলিক, ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রামে কৃষকরা

একটির পর একটি বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢ়ুকে পড়ায় সুনামগঞ্জের কৃষকদের চোখে এখন হতাশা আর অনিশ্চয়তার ছায়া। ডুবে থাকা ক্ষেত আর বাড়ির উঠানে স্তুপ করে রাখা পচা ধানের দুর্গন্ধে চারদিক যখন ভারী হয়ে উঠেছে, ঠিক সেই সময় দুই দিনের টানা বৃষ্টির পর হাওরে রোদের ঝিলিক যেন নতুন করে বাঁচার লড়াইয়ে নামার সাহস জুগিয়েছে কৃষকদের। সুনামগঞ্জ থেকে জামালগঞ্জ সড়কে এখন চোখে পড়ে ভিন্ন এক চিত্র-রাস্তার পাশে ধান শুকানো, কোথাও ধানের স্তুপ, কোথাও সদ্য কাটা ধান জমা করা হচ্ছে, আবার কোথাও মেশিনে ধান ভাঙানোর ব্যস্ততা। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে যে যা পারছেন, বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, শনিবার পর্যন্ত হাওরে ১ লাখ ২১ হাজার ৮৬৪ হেক্টর এবং নন-হাওরে ১৬ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। গড়ে হাওরে ধান কাটা হয়েছে ৬২ শতাংশ। তবে এই হিসাব প্রত্যাখ্যান করেছে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা। তাদের দাবি, বাস্তবে অর্ধেক ধানও কাটা সম্ভব হয়নি। যা কাটা হয়েছে তার বড় অংশই পানিতে পচে নষ্ট হচ্ছে। তাদের মতে, ডুবে যাওয়া ও পচা ধান বাদ দিলে কৃষকরা এবার মাত্র ৩০ শতাংশ ধান ঘরে তুলতে পারবেন। গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে কৃষকরা যেমন ধান শুকাতে পারেননি, তেমনি হাওরে নেমে ধান কাটাও বন্ধ ছিল। তবে আজ রোদের দেখা মিলতেই কৃষকরা আবার হাওরে নেমে পড়েছেন। অন্যদিকে কৃষাণীরা ঘরে ও উঠানে ধান শুকাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের কৃষক আকবর জানান, রোদ উঠতেই তিনি ডুবে যাওয়া ধান কাটার প্রস্তুতি নিয়েছেন। কিন্তু শ্রমিক সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। “এক মন ধান দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিজন শ্রমিককে এক হাজার থেকে এক হাজার দুইশত টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে,”বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, সরকার ১,৪৪০ টাকা দরে ধান কেনার ঘোষণা দিলেও গ্রামে কৃষকরা বাধ্য হয়ে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায় ধান বিক্রি করছেন। “সরকারি গুদামে যে মানের ধান লাগে, এবার সে মানের ধান আমাদের কাছে নেই। তাই দালালদের কাছেই বিক্রি করতে হচ্ছে,”যোগ করেন তিনি।

কৃষাণী প্রতিমা রানী দাস জানান, এখনো তার পাঁচ কেদার ধান পানির নিচে। “ধান কাটার জন্য মানুষ পাচ্ছি না। ঘরে যে ধান আছে, সেটি শুকাতে আরও তিন দিন লাগবে। এভাবে রোদ থাকলে শুকানো শেষ করে পরে পানির নিচের ধান কাটার চেষ্টা করবো,”বলেন তিনি। হাওরের পানিতে নেমে ধান কাটতে গিয়ে শ্রমিকদেরও পড়তে হচ্ছে নানা সমস্যায়। শ্রমিক দেলোয়ার হোসেন বলেন, “ঠান্ডা পানি আর জোঁকের আক্রমণ-এই দুই সমস্যায় কাজ করতে খুব কষ্ট হচ্ছে।” এবার মার্চের মাঝামাঝি থেকেই জেলায় বৃষ্টি শুরু হয়। উজান থেকে নেমে আসে পাহাড়ি ঢল। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে টানা চার দিন কৃষকরা হাওরে নামতেই পারেননি। এতে অনেক হাওরের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যায়। একই সঙ্গে একের পর এক বাঁধ ভেঙে পানি ঢ়ুকে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৩৭টি হাওরে এবার বোরো আবাদ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে নিচু হাওর এলাকায় রয়েছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমি। প্রাথমিক হিসাবে অতিবৃষ্টি ও ঢলে প্রায় ১৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে জলাবদ্ধতায় ক্ষতি হয়েছিল আরও ২ হাজার হেক্টর জমির। সব মিলিয়ে জেলায় প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ধানের ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “হাওরে রোদ উঠা কৃষকসহ সবার জন্য স্বস্তির খবর। এভাবে আরও কয়েকদিন রোদ থাকলে কৃষকরা বাকি ধান ঘরে তুলতে পারবেন।” তবে তিনি জানান, ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণ করতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে