বৈশাখের আলো ঝলমল সকালে তখন আমের মুকুলের সেই পরিচিত ঘ্রাণ ফিকে হয়ে এসেছে, তার বদলে বাতাসে ভাসছে পাকা আমের মিষ্টি এক মাদকতা। ক্যালেন্ডারের পাতা ধরে মঙ্গলবার (৫ মে) থেকেই সাতক্ষীরার আমবাগানগুলোতে শুরু হলো উৎসব। মৌসুমি ফলটির মধুমাখা স্বাদ দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আম নামানো শুরু করেছেন চাষিরা।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ফিংড়ি এলাকার একটি আমবাগান মঙ্গলবার সকাল থেকেই ছিল মুখর। ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক বিষ্ণুপদ পাল যখন আনুষ্ঠানিকভাবে আম পাড়ার উদ্বোধন করলেন, তখন চারপাশজুড়ে এক আনন্দঘন পরিবেশ। অনেক প্রতীক্ষার পর বাঁশের কোটা (আঁকশি) দিয়ে গাছ থেকে নামানো হলো সোনালি রঙের গোবিন্দভোগ আর রক্তিম আভার গোলাপখাস। ঝুড়ি ভরে উঠছে একে একে বোম্বাই আর বৈশাখী আমে। আবহাওয়া আর সাতক্ষীরার মাটির গুণে এখানকার আম পেকে যায় দেশের অন্য অঞ্চলের তুলনায় একটু আগেভাগেই। তাই মে মাসের এই শুরু থেকেই দেশজুড়ে ফলপ্রেমীদের নজর থাকে সাতক্ষীরার দিকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম জানালেন, স্বাদ আর গুণগত মান অটুট রাখতেই এবারও আম পাড়ার নির্দিষ্ট সূচি বা ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ মেনে চলছেন তারা।
তিনি জানান, ৫ মে গোবিন্দভোগ, গোপালভোগ, বোম্বাই ও গোলাপখাস হারভেস্ট করার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৫ মে হিমসাগর (ক্ষীরশাপাতি),২৭ মে রসালো ল্যাংড়া, ৫ জুন মিষ্টি ও সুগন্ধি আম্রপালি ও মল্লিকা জাতের আম হারভেস্ট করার জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আমচাষি আবু সাঈদের চোখে এখন রঙিন স্বপ্ন। তিনি আশা করছেন, আবহাওয়া শেষ পর্যন্ত সহায় থাকলে এবার বাজারে আমের ভালো দাম মিলবে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার জেলায় ৪ হাজার ১৪০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৪৫ হাজার চাষি ঘাম ঝরিয়েছেন। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ৭০ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন ফলন। এই এক মৌসুমে জেলায় প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার আমের বাণিজ্য হবে বলে আশা করছে কৃষি বিভাগ। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে অন্তত ৮০ মেট্রিক টন আম এবার পাড়ি দেবে বিদেশের বাজারেও।
বাজারে যেন কোনোভাবেই অপরিপক্ব বা ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো আম না পৌঁছায়, সেদিকে এবার প্রশাসনের কড়া নজর। আম নামানোর এই মহোৎসবে বাগান থেকে বাজার পর্যন্ত সবখানেই তদারকি চলছে। সাতক্ষীরার আমের যে সুনাম, তা ধরে রাখতে বদ্ধপরিকর প্রশাসন ও চাষিরা। জ্যৈষ্ঠ আসতে এখনও কয়েক দিন বাকি, কিন্তু সাতক্ষীরার আমবাগানগুলো যেন আগেই ঘোষণা করে দিল-মধুমাসের ঢোল বেজে উঠেছে। এবার শুধু ঘরে ঘরে সেই অমৃত স্বাদের পৌঁছানোর অপেক্ষা।