গভীর নলকূপের চাপে নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, বাড়ছে শঙ্কা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ৮ মে, ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
গভীর নলকূপের চাপে নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, বাড়ছে শঙ্কা

রাজধানীতে প্রতিদিন বাড়ছে পানির চাহিদা, আর সেই চাহিদা মেটাতে ভরসা করা হচ্ছে মূলত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর। শত শত গভীর নলকূপ থেকে নিয়মিত পানি উত্তোলনের ফলে ঢাকার নিচের পানির স্তর প্রতিবছরই নিচে নেমে যাচ্ছে। পানি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে নগরবাসীকে বড় ধরনের পানিসংকটের মুখোমুখি হতে হতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে প্রতি বছর গড়ে দুই থেকে তিন মিটার পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। অর্থাৎ যে পানি একসময় তুলনামূলক কম গভীরতায় পাওয়া যেত, এখন তা তুলতে আরও গভীরে যেতে হচ্ছে। এতে যেমন ব্যয় বাড়ছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে পানির নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভূগর্ভস্থ পানি অতিরিক্ত হারে উত্তোলন করা হলেও সেই জলাধার পুনরায় পূরণ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না। স্বাভাবিকভাবে বৃষ্টির পানি মাটির ভেতর প্রবেশ করে যে পুনর্ভরণ প্রক্রিয়া হওয়ার কথা, নগরায়ণ ও কংক্রিটের বিস্তারের কারণে তা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

ঢাকার চারপাশে নদী থাকলেও দূষণের কারণে সেসব নদীর পানি সরাসরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে নদীবেষ্টিত শহর হয়েও রাজধানীর জন্য পদ্মা ও মেঘনার মতো দূরের উৎস থেকে পানি আনতে হচ্ছে। এ জন্য বড় বড় শোধনাগার স্থাপন করা হলেও তা এখনো পুরো চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার, গন্ধর্বপুর প্রকল্প এবং পদ্মা নির্ভর বিভিন্ন উদ্যোগ থেকে পানি সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু নগরীর দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যা ও দৈনিক চাহিদার তুলনায় সেই সক্ষমতা এখনও সীমিত।

বর্তমানে ঢাকায় দৈনিক পানির চাহিদা প্রায় ৩১৫ কোটি লিটার বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হচ্ছে প্রায় ২৯৮ কোটি লিটার। এই সরবরাহের বড় অংশই আসছে হাজারের বেশি গভীর নলকূপের মাধ্যমে। অর্থাৎ নগরীর পানি ব্যবস্থার বড় ভিত্তি এখনো মাটির নিচের পানির ওপর নির্ভরশীল।

গভীর থেকে পানি তুলতে বাড়তি বিদ্যুৎ, যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বাড়ছে। এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে পানির দাম সমন্বয় করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির সংকট শুধু পরিবেশগত নয়, অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক এলাকায় এখনো পানি সরবরাহে মানগত সমস্যা রয়েছে। কোথাও ময়লা পানি, কোথাও গন্ধ, আবার কোথাও চাপ কম-এসব সমস্যাও ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।

নদী গবেষকরা মনে করেন, শুধু নলকূপ বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাজধানীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সময়োপযোগী পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নিতে হবে। নদীর পানি শোধন করে ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং বিকল্প উৎসের দিকে নজর দিতে হবে।

রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের ফেলো মোহাম্মদ আমিনুর রসুল বাবুল বলেন, নগর পরিকল্পনা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং পানি ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। তার মতে, ভবিষ্যৎ জনসংখ্যার চাপ বিবেচনায় নিয়ে এখনই পরিকল্পনা না করলে সংকট আরও বাড়বে।

পরিবেশবিদ অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, জলাধার ধ্বংস, পুকুর ভরাট, খাল দখল ও দূষণ-এসব কারণেও ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ছে। কারণ প্রাকৃতিক জলাধার কমে গেলে পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণও কমে যায়।

পানি বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ঢাকা শহরের খোলা মাটির জায়গা দ্রুত কমে গেছে। কংক্রিটে ঢাকা নগরীতে বৃষ্টির পানি মাটিতে ঢোকার সুযোগ কমে যাওয়ায় রিচার্জ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পানির সংকট তৈরি হতে পারে।

অধ্যাপক আইনুন নিশাতের মতে, যে পরিমাণ ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা নিরাপদ, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক বেশি পানি তোলা হচ্ছে। তিনি মনে করেন, এখনই বিকল্প উৎসে যেতে না পারলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

এদিকে গ্রীষ্ম মৌসুমে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির ব্যবহারও বেড়ে যায়। সেই সময়ে চাপ আরও বাড়ে সরবরাহ ব্যবস্থায়। বর্তমানে ঢাকায় মোট পানির প্রায় ৬০ থেকে ৭১ শতাংশ এখনো গভীর নলকূপ থেকেই আসে, যা নগরীর ভবিষ্যৎ পানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।