বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি আয়োজিত “বাজেট ২০২৬-২৭: গ্রামীণ মজুরের সমস্যা ও করণীয়” শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তাগণ বলেন, জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতসমূহের অন্যতম হলো কৃষি। কৃষিতে উন্নয়নের প্রধান কারিগর ক্ষেতমজুর তথা গ্রামীণ মজুর এবং মেহনতি মানুষ। ক্ষেতমজুররা কৃষি উন্নয়নের কারিগর হলেও এর সুফলের ভাগিদার হওয়ার সুযোগ নেই। ক্ষেতমজুর তথা গ্রামীণ মজুররা ভিক্ষা চায় না- তাঁরা সারা বছর কাজ চায়, ন্যায্য মজুরি চায়, মানুষের মতো বাঁচতে চায়। প্রতিবছর বাজেট হয়, কিন্তু দেশের সিংহভাগ মানুষ এই ক্ষেতমজুর তথা গ্রামীণ মজুরদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। আলোচনা সভায় বক্তারা আসন্ন বাজেটে ক্ষেতমজুরসহ দরিদ্র মানুষের জন্য রেশন, পেনশন, কাজ, ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ রাখার দাবি করেন। শুক্রবার ৮ মে সকালে মুক্তিভবনে আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি ডা. ফজলুর রহমান। আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, ক্ষেতমজুর সমিতির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক এম এম আকাশ, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ। এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের সভাপতি তরিকুল ইসলাম, মনিকগঞ্জের ঘিউর উপজেলার ক্ষেতমজুর ছৈনউদ্দিন, কুমিল্লার চান্দিনার সুফিয়া খাতুন, গাজীপুরের কাপাসিয়ার ফরিদ প্রধান, দেবীদ্বারের তজু মিয়া। সভার প্রবন্ধ পাঠ করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অর্ণব সরকার। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কার্যকরী সভাপতি অ্যাড. আনোয়ার হোসেন রেজা। সভা পরিচালনা করেন সহ সাধারণ সম্পাদক কল্লোল বনিক। আলোচনা সভায় মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন,উন্নয়নের কথা বলা হলেও গরিব মহেনতি মানুষের উন্নতি হচ্ছে না। আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিলাম যেখানে জুলুম থাকবে না, বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু সে স্বপ্ন আজো বাস্তবায়ন হয়নি। তিনি ক্ষেতমজুরসহ গ্রামীণ মজুরদের সচেতন করে অধিকার আদায়ের লড়াই জোরদার করার আহŸান জানান। তিনি বলেন, জমি বর্গা দেওয়া যায়, স্বার্থ বর্গা দেওয়া যায় না। খাসজমি ভূমিহীনদের- তা আদায়ে ভূমিহীনদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ডে যাতে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখার আহŸান জানান তিনি। সভায় অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, বিভিন্ন এনজিও গরিবদের দারিদ্রতা থেকে মুক্তি দেবে বলে উল্টো তাদের ঋণগ্রস্ত করে ফেলেছে। এই ঋণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অনেকে আত্মহত্যাও করছে। তিনি বলেন, গ্রামীণ মজুররা ভিক্ষা চায় না, তারা পরিশ্রম করে বাঁচতে চায়। বাজেটে মজুরদের জন্য সারা বছর কাজের ব্যবস্থার জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। গ্রাম ও শহরের শ্রমিকদের একতাবদ্ধ করতে পারলে দাবি আদায় অনেকটা সহজ হবে। ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, একজন শ্রমিক সারাজীবন কাজ করে যখন বৃদ্ধ বয়সে কাজ করতে পারেন না তখন তিনি অসহায় হয়ে পড়েন। পেনশনের আওতায় বয়ষ্ক শ্রমিকদের মাসিক বেঁচে থাকার মতো মজুরির দাবিটা সামনে আনতে হবে। মজুরের ছেলেকে মজুর হবে- এটা হতে পারে না। তাদের শিক্ষিত করে চাকরির ব্যবস্থা করতে হবে। আয় বৈষম্য, ভোগ বৈষম্য বাড়ছে। উন্নয়নের ভাগ সবাই সমানভাবে পাচ্ছেন না। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রæতি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির ফলে গম, সয়াবিন, গ্যাস সহ বিভিন্ন দ্রব্যাদি কিনতেই হবে। এগুলো অন্য দেশ থেকে কম খরচে আমদানি করা হতো। বেশি দামে আমেরিকা থেকে এসব পণ্য কেনার ফলে এর বেশি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে গরিব মানুষের ওপর। সভায় অন্যান্য নেতৃবৃন্দ বলেন, গ্রামীণ মজুররা যখন ক্ষেতে কাজ থাকে না তখন তারা যেখানে যে কাজ পায় সে কাজ করেই জীবন নির্বাহ করে থাকেন। এই মজুররা কৃষকের জমি লিজ নিয়ে রাতদিন পরিশ্রম করে ফসল ফলান। কিন্তু তারা উৎপাদিত ফসলের লাভজনক দাম পান না। এবার হাওরসহ নিন্মঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ধানক্ষেত নষ্ট হয়ে যায়। সরকারকে এসব অসহায় মানুষকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। সভায় বক্তাগণ বলেন, বজ্রপাতে কেউ মারা গেলে সেই নিহতের পরিবারকে সামান্য পরিমাণ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। বজ্রপাত ও দূর্ঘটনায় নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে কমপক্ষে দশ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেন নেতৃবৃন্দ। সভায় বক্তাগণ আরো বলেন, এমপিদের কাজ সংসদে আইন প্রণয়ন করা। তাদের উপজেলা পরিষদের ভেতরে এমপিদের পরিদর্শন কক্ষ নির্মাণ করলে জনগণের ক্ষমতায়ণে তা সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিপরীতমুখী ও প্রতিবন্ধক হয়ে উঠবে বলে তাঁরা মনে করেন।