বিভিন্ন সংস্থার অভিযানেও নকল ও ভেজাল পণ্যের দখলে দেশের অর্ধেক বাজার

এফএনএস এক্সক্লুসিভ
| আপডেট: ১০ মে, ২০২৬, ১১:৪২ এএম | প্রকাশ: ১০ মে, ২০২৬, ১১:৪২ এএম
বিভিন্ন সংস্থার অভিযানেও নকল ও ভেজাল পণ্যের দখলে দেশের অর্ধেক বাজার

নকল ও ভেজাল পণ্যের দখলে দেশের অর্ধেক বাজার। সরকারি বিভিন্ন সংস্থার নিয়মিত অভিযানে তা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। বরং অভিযানের পরও নকল পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত অব্যাহত রয়েছে। ওষুধ, খাদ্যপণ্য, শিশুখাদ্য, প্রসাধনী থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্যেই ভেজাল ও নকল হচ্ছে। যা দেশের জনস্বাস্থ্যর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। নকল খাদ্যপণ্য ও পানীয়তে ক্ষতিকর রাসায়নিক, অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ ও নিম্নমানের উপাদান থাকে। তাতে খাদ্যে বিষক্রিয়া, পেটের সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা বাড়ে। তাছাড়া নকল প্রসাধনীতে পারদ, স্টেরয়েড ও সিসার মতো ক্ষতিকর উপাদান তৈরি করে ত্বকের অ্যালার্জি ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যহানি। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সূত্র এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ওষুধ, খাদ্য ও পানীয়, মসলা, দুগ্ধজাত পণ্য, সিগারেট, প্রসাধনী, নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্পসহ দেশের প্রায় সব পণ্যই ভেজাল ও নকল হচ্ছে। তবে ভেজাল পণ্যের তালিকায় দুধ, তেল, মধু, কফি, চা, সস, চকোলেট, বোতলজাত পানি, কোমল পানীয় ও শিশুখাদ্যসবচেয়ে বেশি দেখা যায়। বৈধ কোম্পানির পণ্যগুলোর নাম একটু এদিক-সেদিক করে ভেজাল ও নকলের সাথে জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের পণ্য বাজারজাত করে। আর সহজ উৎপাদন প্রক্রিয়া, তুলনামূলক কম দাম, নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা নকল ও ভেজাল পণ্যের বাণিজ্যের প্রসার ক্রমাগত বাড়ছে।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন গবেষণার তথ্যানুযায়ী দেশে দুধ, চা, কফি ও শিশুখাদ্যে বহুল ব্যবহৃত পণ্য ব্যাপক হারে নজল ও ভেজাল হওয়ায় জনস্বাস্থের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিম্নমানের কাঁচামাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতিতে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টি, ডায়রিয়া, সংক্রমণ ও কিডনি জটিলতার আশঙ্কা থাকে। আর প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে লিভার ও হজমজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। মূলত অসাধু ব্যবসায়ীরা বৈধ কোম্পানির ট্রেডমার্ক, প্যাকেজিং ও রং প্রায় হুবহু নকল করায় সহজেই বিভ্রান্ত হচ্ছে ভোক্তারা। ফলে সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বড় বৈধ কোম্পানিগুলোর ব্র্যান্ড সুনাম ও আস্থা। তাছাড়া বৈধ কোম্পানির নামে নকল পণ্য বিক্রি হওয়ায় বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। একই সাথে বৈধ ব্যবসায়ীদের বিক্রিও কমছে।

সূত্র আরো জানায়, ভেজাল ও নজল পণ্যের অবৈধ ব্যবসার প্রসারে কর প্রদানকারী বৈধ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। তাতে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) সরকারের  রাজস্ব ঘাটতি ৭১ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে। অর্থবছর শেষে ওই অঙ্ক ছাড়িয়ে যেতে পারে লাখ কোটি টাকা। মূলত বিভিন্ন খাতে রাজস্ববিহীন কেনাকাটা ঠেকাতে না পারাতেই সরকার এমন ক্ষতির মুখে পড়ছে। যদিও মাঝে মাঝেই দেশে কয়েকটি সংস্থা ভেজালবিরোধী অভিযান চালায়। তাদের মধ্যে আছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। কিন্তু তাতে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি ঘটছে না। বরং দিনের পর দিন সংকট আরো বাড়ছে। 

এদিকে ভেজাল ও নকল পণ্য প্রতিরোধের সাথে জড়িতদের মতে, বাজার তদারকি সংস্থাগুলোর জনবল সংকট, পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা ও তদারকির দুর্বলতায় বাজারে নকল ও ভেজাল পণ্যের ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। পণ্যের সহজ যাচাইয়ের জন্য কিউআর কোড ব্যবস্থা চালু এবং নকলকারীদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। তবে আইনের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থাও অনেক সময় ব্যবস্থা নিতে পারছে না। এ সুযোগে বিএসটিআইয়ের ভুয়া সিল ও বৈধ পণ্যের নাম নকল করে চা, কফি, ভোজ্যতেল, গুঁড়া দুধ, বোতলজাত পানি, কোমল পানীয়, প্রসাধনী, ওষুধ, সিগারেট ও বৈদ্যুতিক পণ্যের রমরমা বিক্রি চলছে। ওসব পণ্য ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরের অনুমোদনহীন কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা কম দামের প্রলোভন ও বিভ্রান্তিকর প্যাকেজিং করে ভোক্তাদের আকৃষ্ট করছেন। কিছু ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে জাল বিএসটিআই স্টিকার ও হলোগ্রাম। ফলে কঠিন হয়ে পড়ছে নকল পণ্য শনাক্ত করা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৬০ কোটি মানুষ অসুস্থ হয় আর প্রায় চার লাখ ৪২ হাজার মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশেও ভেজাল খাদ্যের কারণে প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ ক্যান্সার, কিডনি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। কারণ নকল পণ্য ব্যবহারে দীর্ঘ মেয়াদে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। 

এদিকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ১২৬টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ৫৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেছে। আর শতাধিক মামলাও করা হয়েছে। কিন্তুতারপরও পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হয়নি। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার করা, ভেজাল ও নকল পণ্যের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান পরিচালনা এবং কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। ওসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা জোরদার হওয়ার পাশাপাশি শক্তিশালী হবে সরকারের রাজস্ব আহরণ ও বৈধ ব্যবসার পরিবেশ।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি) ড. মোহাম্মদ মোস্তফা জানান, বর্তমান আইনে জরিমানার সর্বনিম্ন পরিমাণ তুলনামূলক বেশি হওয়ায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনায় অনেক সময় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে সতর্কবার্তা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করতে হয়। লাইসেন্স প্রদান ও তদারকি কার্যক্রমের মধ্যেও সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। এক সংস্থা লাইসেন্স দিলেও অন্য সংস্থা তদারকি করে, ফলে সামগ্রিকভাবে মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ে। সমন্বয়হীনতার কারণেই দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে