ব্যাংক খাতের সংকট

জবাবদিহি ও পুনরুদ্ধারের কঠিন পরীক্ষা

এফএনএস | প্রকাশ: ১০ মে, ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম
জবাবদিহি ও পুনরুদ্ধারের কঠিন পরীক্ষা

দেশের ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও ঋণ কেলেঙ্কারির বিষয়টি নতুন নয়, তবে সাম্প্রতিক সময়ে পত্রিকায় উঠে আসা তথ্য পরিস্থিতির গভীরতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একাধিক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ, তা খেলাপিতে পরিণত হওয়া এবং অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ দেশের আর্থিক খাতের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এতে অন্তত ২৮টি ব্যাংক গুরুতর ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ছয়টি বড় শিল্পগোষ্ঠী ব্যাংক খাত থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে তা যথাযথভাবে পরিশোধ না করে বিদেশে সরিয়ে নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমাবদ্ধতা-সব মিলিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট, আমানতকারীদের আস্থাহীনতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যাংকগুলো বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করেছে। পাশাপাশি একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠন এবং যৌথ তদন্ত দলের কার্যক্রম শুরু হওয়া ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। এই পদক্ষেপগুলো প্রমাণ করে যে, সমস্যার গভীরতা অনুধাবন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন কিছুটা হলেও সক্রিয় হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো-এই উদ্যোগগুলো কতটা কার্যকর হবে? অতীতে দেখা গেছে, বড় অঙ্কের ঋণ কেলেঙ্কারি বা আর্থিক অনিয়মের ক্ষেত্রে তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। ফলে শুধু তদন্ত বা চুক্তি সই করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দ্রুত, স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা। এছাড়া, ব্যাংক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই-বাছাই, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা কঠিন হবে। অর্থ পাচার রোধ ও পাচার হওয়া সম্পদ পুনরুদ্ধার একটি জটিল ও সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো, বিভিন্ন দেশের আইন এবং প্রমাণ সংগ্রহের জটিলতার কারণে এটি সহজ নয়। তবুও এটি এখন সময়ের দাবি। কারণ, এই অর্থ দেশের অর্থনীতির অংশ, যা জনগণের আমানত এবং রাষ্ট্রের সম্পদ। সবশেষে, ব্যাংক খাতের বর্তমান সংকট কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সুশাসন, জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। এই সংকট মোকাবিলায় দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বৃদ্ধি এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা এখন অপরিহার্য। অন্যথায়, এই ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ব্যাহত করতে পারে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে