রাজধানীর মানুষের জন্য পানি সংকট নতুন কিছু নয়। প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি দেখা দেয়, আর এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। অথচ হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মার পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার এই প্রকল্প চালু হওয়ার সাত বছর পার হলেও প্রতিশ্রুত পরিমাণ পানি পাওয়া যাচ্ছে না। দৈনিক ৪৫ কোটি লিটার পরিশোধিত পানি উৎপাদনের কথা থাকলেও বাস্তবে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ২৫ কোটি লিটার। সমস্যার মূল কারণ প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা। পদ্মা নদীর মুন্সীগঞ্জের যশলদিয়া থেকে মিটফোর্ড পর্যন্ত পাইপলাইনে পানি আনার সক্ষমতা থাকলেও ঢাকার ভেতরে সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় পাইপলাইন তৈরি হয়নি। ফলে উৎপাদিত পানি রাজধানীর বাসিন্দাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। একই সঙ্গে মেঘনার পানি পাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। প্রকল্প গ্রহণের পর সময় ও ব্যয় বাড়ানো হলেও চুক্তির শর্ত নিয়ে দীর্ঘসূত্রতায় কাজ শেষ হয়নি। এর ফলে দৈনিক ৫০ কোটি লিটার পানি পাওয়ার সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। শুধু পদ্মা নয়, সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পেও রয়েছে নানা সমস্যা। শুষ্ক মৌসুমে রাজধানীতে পানির চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৩২৫ কোটি লিটার, অথচ উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ২৮০ কোটি লিটার। অর্থাৎ ঘাটতি ৪৫ কোটি লিটার। এই ঘাটতি পূরণে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা স্পষ্ট। জনগণের এখানে কিছু করার নেই, দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে ওয়াসার। প্রশ্ন উঠছে, এত বিপুল অর্থ ব্যয় করার পরও কেন প্রকল্পগুলো কার্যকর হয়নি? কেন রাজধানীবাসী প্রতিনিয়ত পানির সংকটে ভুগছে? পানি জীবনের অপর নাম, আর সেই জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য সম্পদে যদি সংকট দেখা দেয়, তবে তা কেবল নাগরিক দুর্ভোগ নয়, বরং নীতিনির্ধারণী ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। এখন জরুরি হলো প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা। পদ্মা ও মেঘনা থেকে পানি আনার সক্ষমতা থাকলেও তা ঢাকায় পৌঁছাতে হলে পাইপলাইন অবকাঠামো সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে সায়েদাবাদ প্রকল্পের সমস্যাগুলো সমাধান করে উৎপাদন বাড়াতে হবে। পানি সরবরাহে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জনগণ জানতে পারে তাদের করের টাকা কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং কী ফল আসছে। রাজধানীর পানি সংকট কোনো মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ব্যর্থতা। ওয়াসাকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প কেবল কাগজে-কলমে থেকে যাবে, আর নাগরিকরা প্রতিনিয়ত পানির অভাবে ভুগতে থাকবে। পানি সংকট মানে জীবনের সংকট- এই সত্যকে সামনে রেখে দ্রুত সমাধানই এখন সময়ের দাবি।