তৈরি পোশাক খাতের সংকট কাটছেই না

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১২ মে, ২০২৬, ০৮:১৭ এএম
তৈরি পোশাক খাতের সংকট কাটছেই না

দেশের তৈরি পোশাক শিল্প একসময় ছিল রপ্তানির অগ্রদূত; সেই খাত দীর্ঘদিন ধরে নানমুখী সংকটে পড়ে রয়েছে। শিল্প সংগঠন ও ব্যবসায়ীদের সতর্কবার্তা বলছে- গত কয়েক বছরে রপ্তানি আয় কমে যাওয়া, উচ্চ সুদ, জ্বালানি ও কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার তীব্রতা মিলিয়ে খাতটি সংকটাপন্ন। মাঠ পর্যবেক্ষণ, ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট হয়েছে- সমস্যা বহুমাত্রিক; দ্রুত নীতিগত সহায়তা ও কাঠামোগত সংস্কার না হলে ক্ষতি বাড়বে এবং কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে। বিজিএমইএ’র সামপ্রতিক তথ্য বলছে, গত তিন বছরে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া আরও বহু কারখানা আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই তথ্য প্রাক‑বাজেট আলোচনায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে উপস্থাপিত হয়েছিল এবং তারা আগামী বাজেটে নীতি‑সহায়তা দাবি করেছে। শিল্প নেতারা জানাচ্ছেন, ২০২৫‑২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারিতে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মোট পোশাক রপ্তানি আয় ৩.৭৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে; বিশেষত ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে রপ্তানি নিম্নমুখী হওয়ায় কারখানাগুলো পরিমিত সক্ষমতায় চলতে পারছে না- ফিক্সড কস্ট অনুপাতে বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা আর্থিকভাবে টিকে থাকতে পারছে না। খাতের নেতারা বলছেন, ঋণের সুদের হার বর্তমানে ১২‑১৫ শতাংশে পৌঁছেছে; একই সঙ্গে জ্বালানি ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুতের দাম বাড়া এবং রপ্তানি প্রণোদনার হ্রাস- এসব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান প্রস্তাব করেন- নগদ সহায়তার ওপর ১০ শতাংশ হারে আয়কর কর্তন অব্যাহতি, রপ্তানির বিপরীতে উৎসে কর হ্রাস, সোলার পিভি কাঁচামালে শুল্ক সুবিধা ও অন্যান্য কাঁচামালে শুল্ক ছাড়ের মতো প্রণোদনা যাতে খাতকে সহায়তা করে। এদিকে, পোশাক রপ্তানি খাতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চাপও বেড়েছে। দশকের পর দশক ধরে চীন শীর্ষে থাকলেও ২০২৫ সালে ভিয়েতনাম বাংলাদেশের চেয়েও বেশি পোশাক রপ্তানি করেছে- ভিয়েতনামের রপ্তানি ৩৯.৬৪ বিলিয়ন ডলার, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩৮.৮২ বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভিয়েতনামের দ্রুত লজিস্টিক সক্ষমতা, বহুমুখী পণ্যের পোর্টফোলিও এবং মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা তাদের এগিয়ে রেখেছে; অন্যদিকে বাংলাদেশের নির্ভরতা এখনও সীমিত পণ্যে এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ দুর্বল। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন- এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্ক সুবিধা হারালে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বাড়বে। সিপিডি’র সিনিয়র গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বাংলাদেশের রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়ানো, ম্যান-মেড ফাইবারে বিনিয়োগ ও সরবরাহ শৃঙ্খল দ্রুততর করা না হলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। তিনি বলেন, ভিয়েতনামের মতো বহুমুখী পণ্য কাঠামো ও দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। শিল্প নেতারা বলছেন, বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (ঋউও) আকর্ষণ করাও অপরিহার্য। অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যে অগ্রসর হতে বিদেশি বিনিয়োগ প্রযুক্তি, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা নিয়ে আসে- যা উৎপাদনশীলতা বাড়ায় এবং রপ্তানির মান উন্নত করে। বাংলাদেশে ম্যান-মেড ফাইবার ও স্পেশালাইজড টেক্সটাইল খাতে বিনিয়োগ বাড়ালে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্ত হবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে। এদিকে, কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাব সরাসরি শ্রমিক ও স্থানীয় অর্থনীতিতে পড়ছে। বন্ধ হওয়া কারখানার শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হারানো, আয়ের অনিশ্চয়তা ও সামাজিক চাপ বাড়ছে- এগুলো স্থানীয় বাজার ও পরিবারের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিজিএমইএ নেতারা বলছেন, খাতকে টিকিয়ে রাখতে কর ও শুল্কে প্রণোদনা, জ্বালানি ও গ্যাসের স্থিতিশীলতা, এবং রপ্তানি প্রণোদনা পুনর্বহাল করা জরুরি। বিশ্লেষকরা সুপারিশ করছেন- দ্রুত কয়েকটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- রপ্তানি‑উদ্দীপক প্রণোদনা পুনর্বহাল ও টার্গেটেড করছাড়, সোলার পিভি ও অন্যান্য সবুজ প্রযুক্তির কাঁচামালে শুল্ক সুবিধা, লজিস্টিক ও বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, ম্যান-মেড ফাইবার ও টেক্সটাইল ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজে বিনিয়োগ উৎস সৃষ্টি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রণোদনা ও সহজতর নীতিমালা। এসব পদক্ষেপ না নিলে খাতের পুনরুদ্ধার ধীর হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হতে পারে। এছাড়া, সংশ্লিষ্টরা এই খাতের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপরেও জোর দিয়েছেন। তারা বলছেন, কারখানাগুলোকে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন ও মান নিয়ন্ত্রণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, শুধুমাত্র প্রণোদনা নয়, দীর্ঘমেয়াদী কৌশল দরকার, যেমন- পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো, উচ্চমূল্য সংযোজিত পণ্যে মনোযোগ ও সরবরাহ শৃঙ্খলকে দ্রুততর করা।