সাতক্ষীরা শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের নিভৃত গ্রাম ভালুকা চাঁদপুর। গ্রামের কর্মকার পাড়ায় ঢ়ুকতেই কানে আসে কান্নার করুণ সুর। সেই সুরের উৎস শফিকুল ইসলামের জীর্ণ বাড়ি। অন্যদিকে, শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে আশাশুনি উপজেলার কাদাকাটি গ্রামেও বইছে একই শোকের মাতম। সেখানে তরুণ অবিবাহিত নাহিদুলের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস।
লেবাননের নাবাতিয়েহ এলাকার জেবদিন গ্রামে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন এই দুই বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধা। অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে যারা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ভিটেমাটি আর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন পরবাসে, সেখানে ফলের দোকানে কাজ করতেন তারা। আজ তাঁদের মৃত্যুর খবর এলাকায় এনে দিয়েছে পাথরের নীরবতা। শফিকুলের ঘরে দুই মেয়ের কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। কোন সান্ত্বনায় তাঁদের থামানো যাচ্ছে না। শফিকুল ইসলামের বাড়ি গিয়ে দেখা যায় এক বিভীষিকাময় শোকের দৃশ্য। শফিকুলের স্ত্রী রুমা খাতুন যেন পাথর হয়ে গেছেন। কিছুক্ষণ পর পর জ্ঞান হারাচ্ছেন, আর জ্ঞান ফিরলেই বিলাপ করে বলছেন, "ওগো, তুমি কেন আমাদের একা ফেলে চলে গেলে? মেয়ে দুটোর কী হবে? কার কাছে ওরা বাবার আবদার করবে?"
রুমা খাতুন বলেন, দশ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশ যায় শফিকুল। এখন সুদে-আসলে সেই ঋণের মাত্রা প্রায় ১২ লাখে ঠেকেছে। কীভাবে এই ঋণ শোধ হবে আর কীভাবে দুই মেয়ের লেখাপড়া চালাবেন? কীভাবে চলবে সংসার? এভাবে বিলাপ করতে করতে মূর্ছা যাচ্ছেন তিনি। শফিকুলের বড় মেয়ে তামান্না আক্তার মৌ এবার এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। বাবার স্বপ্ন ছিল মেয়েকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করবেন। বাবার সেই স্বপ্নের কথা মনে করে মৌ বারবার মুর্ছা যাচ্ছে। সে ডুকরে কেঁদে বলছে, "বাবা তো বলেছিল ঈদে আমাদের জন্য নতুন জামা পাঠাবে। এখন বাবার বদলে লাশ আসবে কেন? আমি এখন কাকে বাবা বলে ডাকব?"
পাশেই বসে কাঁদছে ছোট মেয়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী তন্নি আক্তার বৃষ্টি। বাবার অভাব বুঝতে শেখার আগেই সে আজ এতিম। বৃষ্টির কান্নায় প্রতিবেশী মহিলারাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না। শফিকুলের মা মাটিতে আছাড়ি-পাছাড়ি করছেন। তাঁর বিলাপ যেন থামছেই না। শফিকুলের প্রতিবেশী ও স্থানীয় স্কুলের শিক্ষক আল কালাম আবু ওয়াহিদ বলছিলেন, "শফিকুল ছিল পরিবারের একমাত্র আশার আলো। গত ২০ রমজান অনেক স্বপ্ন নিয়ে সে বিদেশে গিয়েছিল। এখনো এক মাসও পূর্ণ হয়নি, এর মধ্যেই সব শেষ।" ধুলিহর ইউপি সদস্য ফারুক হোসেন মিঠু বলেন, "শফিকুল অনেক পরিশ্রমী ছেলে ছিল। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সে লেবানন গিয়েছিল পরিবারের সুদিন ফেরানোর লড়াই শুরু করতে। কিন্তু লড়াই শুরু হওয়ার আগেই ঘাতক ড্রোনের আঘাতে সব চূর্ণ হয়ে গেল।"
লেবাননের স্থানীয় সময় সোমবার দুপুর। বৈরুতের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, নাবাতিয়েহ প্রদেশের জেবদিন গ্রামের একটি আবাসিক বাড়িতে অতর্কিত ড্রোন হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী। ওই বাড়িতেই থাকতেন সাতক্ষীরার শফিকুল ইসলাম (৩৮) এবং নাহিদুল ইসলাম (২৬)। হামলায় ধসে পড়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন তাঁরা। ঘটনাস্থলেই তাঁদের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় শফিকুল ও নাহিদুল ছাড়াও একজন সিরীয় নাগরিক নিহত হয়েছেন।
এর কিছুক্ষণ আগেই ওই এলাকার একটি রুটি বহনকারী ভ্যানে ড্রোন হামলায় আরও দুই স্থানীয় বাসিন্দা প্রাণ হারান। অর্থাৎ, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ওই এলাকা দ্বিতীয় দফা হামলার শিকার হয়। বর্তমানে দুই বাংলাদেশির মরদেহ নাবাতিয়েহর নাবিহ বেররী হাসপাতালে রাখা হয়েছে।
নাহিদুলের বাড়িতেও চলছে স্বজনদের আহাজারি। আশাশুনির কাদাকাটি গ্রামের আব্দুল কাদেরের ছেলে নাহিদুল ইসলাম। মাত্র ২৬ বছর বয়সেই সংসারের হাল ধরতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তিনি। বাবা-মায়ের দুই সন্তানের মধ্যে নাহিদ ছিলেন বড়। নাহিদুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্বজনদের উপচে পড়া ভিড়। মা বিলাপ করতে করতে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। তিনি বিড়বিড় করে বলছেন, "বাবা রে, তুই তো বললি ভালো আছিস, কয়েক দিন পর টাকা পাঠাবি। এখন তোর লাশ কেন আসবে?" নাহিদুলের বাবা আব্দুল কাদের নির্বাক হয়ে বসে আছেন, তাঁর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। দরিদ্র পরিবারে সচ্ছলতা আনতে চড়া সুদে ঋণ করে তাঁকে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল, সেই ঋণের কথা মনে করে স্বজনরা আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন। ধুলিহর ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, "এই দুটি পরিবার অত্যন্ত অসহায়। ঋণ করে সন্তানদের বিদেশে পাঠিয়েছিলেন তারা। শফিকুলের মেয়ে দুটি এখন পড়াশোনা করবে কীভাবে? পরিবার দুটি এখন অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে গেছে। ঋণের টাকা কে শোধ করবে, আর এই এতিম সন্তানদের কে দেখবে?"
উল্লেখ্য, গত ১৬ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও বাস্তবে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি বাহিনীর সংঘাত থামেনি। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, গত মার্চ থেকে শুরু হওয়া অভিযানে দেশটিতে এ পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৮৬৯ জন নিহত হয়েছেন। এই সংঘাতের বলি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ এবং আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের নিরপরাধ প্রবাসী শ্রমিকরা। সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব দত্ত বলেন, নিহত ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। মরদেহ দেশে আনার জন্য প্রয়োজনীয় সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। স্বজনদের একমাত্র দাবি, সরকারি ব্যবস্থাপনায় যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে শফিকুল ও নাহিদুলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। সেই সাথে অসহায় এই পরিবার দুটির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সরকারের কাছে বিশেষ আর্থিক সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।
গ্রামের মেঠোপথ ধরে ফেরার পথে কানে বাজছিল স্ত্রী রুমা খাতুন আর দুই কিশোরী মেয়ের বিলাপ। যে স্বপ্ন নিয়ে তাঁরা শফিকুলকে বিমানবন্দরে বিদায় জানিয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন আজ লেবাননের ধ্বংসস্তূপে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। সাতক্ষীরার এই দুই নিভৃত পল্লীর ঘরে ঘরে এখন শুধু দীর্ঘশ্বাস আর শূন্যতা।