কুড়িগ্রাম পিটিআই সুপারের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

এফএনএস (প্রহলাদ মণ্ডল সৈকত; রাজারহাট, কুড়িগ্রাম) : | প্রকাশ: ১২ মে, ২০২৬, ০৭:০১ পিএম
কুড়িগ্রাম পিটিআই সুপারের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

কুড়িগ্রাম পিটিআই সুপারেন্টেন্ড জয়নুল আবেদীনের বিরূদ্ধে ১১ লক্ষ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে ভুয়া বিল, অতিরিক্ত ভাতাসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ১১লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, কুড়িগ্রাম প্রাইমারী টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) সুপারেন্টেন্ডের স্বেচ্চারিতার কারণে জঙ্গলের ভাগারে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির পরীক্ষণ বিদ্যালয়, মহিলা ও পুরুষ হোস্টেলগুলো। প্রতিষ্ঠান চত্বরে বহিরাগতদের মাদক সেবনের অভরায়ণ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন অভিভাবক ও শিক্ষকগণ।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, জয়নুল আবেদীন ২০২৪ সালের ১০ অক্টোবর সুপারেন্টেন্ড হিসেবে যোগদানের পর থেকে স্বেচ্চারিতার মাধ্যমে বিকলাঙ্গ করে তোলেন প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার। সুপারের এমন কর্মকান্ডে অতিষ্ট হয়ে পড়েছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের নামে প্রায় ১১লাখ টাকা আত্মসাত করাসহ সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগ পেয়েছে অডিট টিম। এরমধ্যে প্রধান কারণগুলো হলো, যোগদানের পর সুপারের বাসভবন সংস্কার না করেই সরকারি বিধির তোয়াক্কা না করেই প্রতিষ্ঠানের গেস্ট রুমে অবস্থান করা। এসময় তিনি সরকারের নির্ধারিত ভাড়া বাবদ ৪ লাখ ৩২ হাজার টাকা, টিচিং লার্ণিং মেটারিয়ালস ১০হাজার টাকা, মনোহরি ৬০হাজার টাকা, সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে উপজেলা পর্যায় যাতায়াত করে রাত্রি যাপন দেখিয়ে ভুয়া ভ্রমণ বিল ৫০হাজার টাকা, সরঞ্জামাদি ক্রয় ২০হাজার টাকা, তথ্য পুস্তক ক্রয়-এক লাখ ১৩ হাজার ৪শ টাকা, ম্যাগাজিন ২০ হাজার টাকা,পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য ৬৩হাজার টাকা, শিক্ষকদের একদিনের ডিএ ভাতা-৪৬ হাজার ৬১৫টাকা, আইসিটি প্রশিক্ষণ ২৩৩জনের একদিনের ডিএ ভাতা এক লাখ ৬৩হাজার ১শ টাকা, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষদের প্রশিক্ষণে নতুন ব্যানার বাবদ-১০০০টাকা, তাদের দুপুরে খাবারসহ সকাল-বিকাল নাস্তার জন্য ৪৬০টাকা আত্মসাত করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পিটিআই প্রাঙ্গনটি জঙ্গলের ভাগারে পরণিত হয়েছে। সেখানে মশা, পোকাপাকড়ের উপদ্রব বেড়ে গেছে। ফলে পরীক্ষণ বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদানসহ পুরুষ, মহিলা হোস্টেল থাকা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। প্রধান গেট দিনরাতে উম্মুক্ত থাকায় বহিরাগতদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত আর মাদক সেবিদের অভায়রণ্য হয়ে ওঠায় প্রশিক্ষণ আসা শিক্ষক-কর্মকর্তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সুপারের প্রতি মাসে বাসা ভাড়া কাটনোর নিয়ম থাকলেও কর্তন না করে তিনি বেতন ভাতার সাথে বাসা ভাড়া উত্তোলন করেছেন। প্রশিক্ষণার্থীরা পারিবারিক সমস্যার কারণে ছুটি নিতে গেলে তিনি তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। নানা সমস্যায় জর্জরিত পিটিআই ও বিটিপিটি প্রশিক্ষণার্থীরা সুপারের নিকট সমস্যা তুলে ধরলেও তিনি প্রতিকারের কোন উদ্যোগ নেননি। গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সংস্কার এর জন্য প্রাক্কলন চাইলেও তিনি এলজিডিকে সমস্যার কথা জানাননি ও প্রাক্কলন এর ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করেননি। ফলে শত ভোগান্তির মধ্যে প্রশিক্ষণ নিতে বাধ্য হচ্ছেন প্রশিক্ষণার্থীরা। অভিভাবক বিথি আকতার, বুলবুলি, আশরাফুলসহ অনেকেই বলেন,নএমন সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোন নিয়ম নেই। মনগড়াভাবে চলছে এই প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষণ বিদ্যালয়ের দোলনাগুলো পরিত্যক্ত পড়ে আছে। গেট খোলা থাকায় বিদ্যালয় মাঠে বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াতসহ প্রাকৃতিক কাজকর্ম এখানে সাড়েন। ফলে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। এছাড়াও এখানে মাদক সেবি এবং জুয়া খেলার জন্য নিরাপদস্থানে পরিণত হয়েছে। এসব বিষয়ে সুপারকে একাধিকবার বলা হলেও তিনি কোন প্রতিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একাধিক পুরুষ-মহিলা শিক্ষক বলেন, আমাদের ট্রেনিং শেষে ভাতা দেয়ার নিয়ম থাকলেও এখনো কোন ভাতা পাইনি। শুনেছি মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে দিবে। আর খাবারের জন্য আমাদের বরাদ্দ কত টাকা সেটা আমরা জানিনা। তবে আমাদের প্রশিক্ষণকালীন আলাদা তরকারি দিয়ে দুপুরে খাবার দিতো। সকাল-বিকাল বিস্কুট-চা দিতো। সব মিলিয়ে যে খাবার দিতো তাতে করে ৩০০টাকা ব্যয় হবে। এক বছর আগের লেখা ব্যানার দিয়েই আমাদের প্রশিক্ষণ নেয়া হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাজশাহী বিভাগ থেকে আসা একাধিক ইনস্ট্রাক্টর বলেন, পিটিআই এর মধ্যে থাকার ব্যবস্থা না থাকায় আমাদেরকে বাইরে হোটেলে থাকতে হচ্ছে। আর নারী কর্মকর্তাদের মহিলা হোস্টেলে রাখার ব্যবস্থা করা হলেও সেখানে কোন পরিবেশ নেই। ফ্যান নষ্ট, খাটগুলো ভাঙ্গা, ময়লা-অপরিষ্কার, গন্ধ আর শ্যাত শ্যাতে পরিবেশে রাখা হয়েছে। আমাদের সকলকেই বাইরের হোটেলে খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলেন, সুপার স্যার যোগদানের পর থেকে তিনি গেস্ট রুমে থাকছেন। গত বছর তার বাসভবনটি পরিত্যক্ত করার জন্য অনেক চেষ্টা করেন। তবে গণপূর্ত বিভাগ থেকে একটি পরিদর্শন দল সেটি সংস্কার করে বসবাসের উপযোগী বলে মতামত দেয়। কিন্তু তিনি সংষ্কারের উদ্যোগ না নিয়ে গেস্ট রুমেই থাকছেন নামমাত্র ভাড়া দিয়ে। প্রশিক্ষণে পুরাতন ব্যানার ব্যবহার, ভুয়া বিলভাউচার দিয়ে বিভিন্ন অর্থ উত্তোলন করেন। কিন্তু বাস্তবে সেগুলোর কোন কাজই হয়নি।

অডিটর জয়ন্ত বলেন, আমরা বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অডিট করেছি। কুড়িগ্রাম পিটিআই এ অর্থ তছরূপের বিষয়ে অসঙ্গতি পাওয়া গেছে। তা আমরা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। কুড়িগ্রাম পিটিআই'র সুপারিটেনডেন্ট জয়নুল আবেদীন অডিট টিমের অডিটে অসঙ্গতির বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সেগুলোর বিষয়ে আমি যথাযথ উত্তর দিয়েছি। প্রশিক্ষণার্থীদের ভাতা প্রদানের বিষয়ে জানান বরাদ্দ আসলে মোবাইল ব্যাংকিং এ দেয়া হবে। আর বাসভবনটি পরিত্যক্ত হওয়া তিনি গেস্ট রুমে থাকার কথা স্বীকার করেন। অর্থ আত্মসতের  অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে