বন্ধ থাকা চিনিকলগুলোতে আশার আলো

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১৩ মে, ২০২৬, ০৮:০৮ এএম
বন্ধ থাকা চিনিকলগুলোতে আশার আলো

সরকার বন্ধ থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত ছয়টি চিনিকল পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংসদের সামপ্রতিক অধিবেশনে ঘোষণা করেছেন শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। মন্ত্রীর ভাষ্য, পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে; তবে তা সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করছে কাঁচামাল বা আখের পর্যাপ্ত প্রাপ্তির ওপর এবং অর্থায়ন ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির ওপর। মন্ত্রী বলেন, চাষি পর্যায়ে আখের সরবরাহ নিশ্চিত হলে পর্যায়ক্রমে কলগুলো উৎপাদনে ফিরবে। মন্ত্রী ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে আশার আলো ছড়ালেও বাস্তবে মিলগুলো মাঠে ফিরবে কি না- এ প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। পাবনা, রংপুর, কুষ্টিয়া, পঞ্চগড়, শ্যামপুর ও সেতাবগঞ্জ- এই ছয়টি মিল দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় সেখানে জমে থাকা ঋণ, নষ্ট হওয়া যন্ত্রপাতি ও বেকারত্বের ছায়া গ্রামাঞ্চলকে গ্রাস করেছে। জানা যায়, পাবনা সুগার মিলের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে ছয় বছর ধরে। দেশের অন্যতম বৃহৎ এ চিনিকল বন্ধ থাকায় নষ্ট হচ্ছে প্রায় ৮০ কোটি টাকার যন্ত্রাংশ ও মালামাল। পাবনা মিলের কাহিনি শুধু একক ঘটনা নয়; রংপুর চিনিকলের চিত্রও তেমনই করুণ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রংপুর চিনিকলের কারখানার চত্বর জঙ্গলে পরিণত হয়েছে, কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি মরিচা ধরে বিকল হয়ে যাচ্ছে এবং স্থানীয় আখচাষিরা ও শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বন্ধ মিলগুলোর ওপর সরকারি ঋণের বোঝাও বাড়ছে- পাবনা মিলের ক্ষেত্রে ৫৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার ঋণ ও বছরে গড়ে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা সুদ যোগ হচ্ছে; রংপুর মিলের ওপরও শতকোটি কোটি টাকার লোকসানের হিসাব রয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, মিল বন্ধ থাকায় আখচাষের পরিধি সংকুচিত হয়েছে; বহু কৃষক বিকল্প ফসলের দিকে সরে যাচ্ছেন। পাবনা চিনিকলের আখচাষি কল্যাণ সমিতির সভাপতি শাহজাহান আলী বাদশা বলেন, পাবনা চিনিকলের উৎপাদন সক্ষমতা ও চিনির মান দেশের অন্যান্য মিলের তুলনায় ভালো ছিল। মিলটি চালু হলে আখচাষিরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হতেন। রংপুরের আখচাষি আলতাফ হোসেনও বলেন, মিল চালু হলে এলাকার মানুষ আর বেকার থাকবে না- এই দাবি কেবল আবেগ নয়, মাঠ পর্যবেক্ষণ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ মিলের পুনরুদ্ধারকে ন্যূনতম অর্থনৈতিক যুক্তিতেই সমর্থন করে। তবে মন্ত্রীর ঘোষণার পরও বাস্তবায়নের পথে তিনটি বড় বাধা স্পষ্টভাবে দাঁড়িয়ে আছে- অর্থায়ন, জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। ২০২৪ সালে গঠিত টাস্কফোর্স বন্ধ মিলগুলো চালুকরণের সুপারিশ করেছিল; টাস্কফোর্সের রিপোর্ট অনুযায়ী সেতাবগঞ্জ ও রংপুরের জন্য যথাক্রমে ৮২৩ কোটি ও ৫৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ায় পরিকল্পনা মাঠে নামেনি। শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেট‑বরাদ্দ ছাড়া মিলগুলো চালু করা সম্ভব নয়। অর্থ ছাড় না থাকা সবচেয়ে বড় বাধা হলেও সমস্যা কেবল অর্থ নয়। বিএসএফআইসি‑র কাছে বর্তমানে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল নেই। জানা যায়, ২০১২ সালে যে নিয়োগ হয়েছিল, তাদের অনেকেই পদোন্নতি বা বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন; ২০২০ সালে ছয়টি মিল বন্ধ হওয়ার পর ওই মিলগুলোর জনবল চালু থাকা অন্য মিলে সরিয়ে নেওয়া হয়। বর্তমানে বিএসএফআইসি ও চালু মিলগুলোতে মোট জনবল রয়েছে প্রায় ৬ হাজার- যেখানে প্রয়োজন প্রায় ১৭ হাজার কর্মকর্তা‑কর্মচারী। মিলগুলো পুনরায় চালু হলে ব্যাপক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে; তা ছাড়া মিল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা দ্রুত পুনরুদ্ধার করা জরুরি। এদিকে, প্রশাসনিক শূন্যতাও সমস্যা বাড়িয়েছে। বিএসএফআইসি‑র শীর্ষ পদগুলোতে শূন্যতা, অতিরিক্ত দায়িত্বে পরিচালনা ও বিভাগীয় প্রধানদের অনুপস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নকে ধীর করে দিয়েছে। বোর্ড‑স্তরের স্থিতিশীলতা না থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে- এগুলো মিল পুনরুদ্ধারের পথে অদৃশ্য বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মিলগুলোকে কেবল চালু করলেই হবে না- তাদের লাভজনক ও টেকসই করে তোলা জরুরি। পাবনা মিলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আখতারুজ্জামান বলেন, মিলটি পুনরায় চালু করে আধুনিক মেশিন ও দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে; পাশাপাশি চিনির সঙ্গে বিভিন্ন উপজাত যেমন স্পিরিট, জৈবসার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে মিলকে লাভজনক করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মিলগুলোকে কো‑জেনারেশন (বিদ্যুৎ উৎপাদন), বায়ো‑স্পিরিট ও জৈব সার উৎপাদনের মতো উপপণ্য উৎপাদনে রূপান্তর করা গেলে আয়ের উৎস বাড়বে এবং পরিবেশগত ব্যবস্থাও শক্ত হবে। আধুনিক টেকনোলজি প্রয়োগে শর্করা উত্তোলন হার বাড়ালে মিলের লাভজনকতা নিশ্চিত করা সম্ভব। সরকারি উদ্যোগ বাস্তবে রূপ পেতে হলে কয়েকটি কার্যকর ধাপ জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন- প্রথমত, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে তাৎক্ষণিক ও পর্যায়ক্রমিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, এক বা দুই মিলকে পাইলট হিসেবে দ্রুত চালু করে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সরবরাহ‑চেইন যাচাই করা; তৃতীয়ত, জনবল পুনর্গঠন ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম হাতে নিয়ে অভিজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ার ও অপারেটরদের আকৃষ্ট করা; চতুর্থত, পাবলিক‑প্রাইভেট পার্টনারশিপ (চচচ) ও আন্তর্জাতিক সহায়তা বিবেচনায় এনে আধুনিকায়ন ও ভ্যালুচেইন‑উন্নয়ন করা। এদিকে, শ্রমিক সংগঠন, আখচাষি সমিতি ও স্থানীয় নেতারা দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ দাবি করে আসছেন। তারা বলছেন, কেবল ঘোষণায় কাজ হবে না- স্বচ্ছতা, সময়সীমা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা চাই। পাবনা ও রংপুরের মতো অঞ্চলের সাধারণ মানুষও এখন প্রত্যাশায় আছে- মিল চালু হলে তাদের জীবিকা ফিরে পাবে, না হলে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি অনিবার্য। শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীর ঘোষণাটি একটি আশার বার্তা; কিন্তু সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়াতে হবে, অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং স্থানীয় স্তরে আখচাষি ও শ্রমিকদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। নইলে এই মিলগুলো কেবল ভবনের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রপাতি ও ঋণের হিসাবেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে মত সংশ্লিষ্টদের।