মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা ভাঙতে নতুন শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১৫ মে, ২০২৬, ০৮:২৯ এএম
মধ্যপ্রাচ্য নির্ভরতা ভাঙতে নতুন শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ

মধ্যপ্রাচ্য‑নির্ভরতা কমাতে নতুন শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার অন্তত ১৬টি দেশে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর সম্ভাবনা যাচাই করার জন্য খসড়া সমঝোতা স্মারক পাঠিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নতুন গন্তব্যে কর্মী প্রেরণ শুরু হবে এবং রেমিট্যান্স উৎস বৈচিত্র্য পাবে- তবে সফলতার জন্য দরকার কূটনৈতিক তৎপরতা, গুণগত প্রশিক্ষণ ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া। সরকারি হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে দেশের মোট প্রবাসী কর্মীর ৭০‑৭৫ শতাংশই মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত; তার মধ্যে সৌদি আরব একাই ৩০‑৩৫ শতাংশের গন্তব্য। মোট রেমিট্যান্সেরও বড় অংশ ওই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। মন্ত্রণালয় মনে করছে, এই একতরফা নির্ভরতা রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক ঝটকা বা অঞ্চলভিত্তিক সংকটের সময় রেমিট্যান্স প্রবাহ ও কর্মসংস্থানে বড় ধাক্কা দিতে পারে- এ কারণেই নতুন বাজার খোঁজা জরুরি। সরকারি পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ঝুঁকি কমাতে এবং প্রবাসী কর্মীর জন্য বিকল্প গন্তব্য তৈরি করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। নতুন বাজার খোলার ফলে রেমিট্যান্স উৎস বৈচিত্র্য পাবে, কর্মী প্রেরণের ওপর একক নির্ভরতা কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের বৈদেশিক আয় স্থিতিশীল হবে- এগুলোই উদ্যোগ গ্রহণের মূল যুক্তি। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদেশি শ্রমবাজার সমপ্রসারণের পথে কয়েকটি কাঠামোগত বাধা রয়েছে- ভিসা‑শর্ত ও প্রবেশাধিকার জটিলতা, গন্তব্যদেশের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতার ঘাটতি, নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতার অভাব এবং কূটনৈতিক সমন্বয়ের দুর্বলতা। ইউরোপীয় ও উন্নত বাজারে ভিসা‑প্রক্রিয়া কঠোর হওয়ায় নিয়মিত কর্মী প্রেরণ সহজ নয়; অনেক দেশ অবৈধ শ্রমিক ফেরত আনার শর্তে ডিমান্ড লেটার দিতে চায়, যা কূটনৈতিক সমঝোতা ছাড়া কার্যকর হবে না। এদিকে, দক্ষতার ঘাটতাও বড় সমস্যা। গন্তব্যভিত্তিক দক্ষতা না থাকলে কর্মী প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে; ফলে শুধু এমওইউ থাকলেই কাজ হবে না- প্রশিক্ষণ, সার্টিফিকেশন ও দক্ষতা‑ম্যাচিং বাধ্যতামূলক। নিয়োগ এজেন্টদের নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা না থাকলে দুর্নীতি ও অনিয়ম বাড়ে, যা শ্রমিকদের সুরক্ষা ও গুণগত নিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। মন্ত্রণালয় বলছে, খসড়া সমঝোতা স্মারকগুলো আইনগত ভেটিংয়ের পর মন্ত্রিপরিষদ অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে; অনুমোদন পেলে গন্তব্যদেশ থেকে অফিসিয়ালি ডিমান্ড লেটার চাওয়া হবে এবং পরবর্তী ধাপে পাইলট প্রেরণ শুরু হবে। তালিকাভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউরোপের কয়েকটি দেশ, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ এবং আফ্রিকার কিছু গন্তব্য- প্রতিটি ক্ষেত্রে ভিসা, শ্রম অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি প্রয়োজন হবে। সরকারি পরিকল্পনায় প্রথম ধাপে ২‑৩ দেশে পাইলট প্রেরণ করে ফলাফল যাচাই করার কথা বলা হচ্ছে। পাইলট সফল হলে ধাপে ধাপে বাকি দেশগুলোতে সমপ্রসারণ করা হবে। একই সঙ্গে গন্তব্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন চালু করা এবং নিয়োগ এজেন্টদের জন্য অনলাইন রেজিস্ট্রি ও মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব রয়েছে। অভিবাসন ও নিয়োগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সমঝোতা স্মারক পাঠানোই যথেষ্ট নয়- সফল বাস্তবায়নের জন্য দরকার কূটনৈতিক লবিং, ডেলিগেশন টিম পাঠানো, কোম্পানি ভিজিট ও সরাসরি নিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা। দক্ষতা‑ম্যাচিং না হলে ইউরোপীয় বাজারে প্রবেশ কঠিন হবে; তাই গন্তব্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সার্টিফিকেশন জরুরি। নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর লাইসেন্সিং ও মনিটরিং সিস্টেম চালু করতে হবে। নতুন বাজার খুললে রেমিট্যান্স উৎস বৈচিত্র্য পাবে, মধ্যপ্রাচ্য‑ঝুঁকি কমবে এবং কর্মসংস্থান বিকল্প সৃষ্টি হবে- এসব সুবিধা দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। তবে ঝুঁকিও কম নয়: ভিসা‑শর্তে ব্যর্থতা, গন্তব্যদেশে শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘন, নিয়োগ‑মধ্যস্থতায় দুর্নীতি এবং প্রত্যাবর্তন‑সংকট সম্ভাব্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষত উন্নত বাজারে প্রবেশে দক্ষতা ও সার্টিফিকেশন না থাকলে কর্মী পাঠানো কঠিন হবে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারি ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে যে বাস্তব পদক্ষেপগুলো জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে, সেগুলো হলো- প্রথমত, এমওইউ‑এ শ্রম অধিকার, সামাজিক সুরক্ষা ও অভিযোগ নিষ্পত্তি মেকানিজম স্পষ্টভাবে সংযোজন; দ্বিতীয়ত, প্রথম ধাপে ২‑৩ দেশে পাইলট প্রেরণ করে ফলাফল যাচাই; তৃতীয়ত, গন্তব্যভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন চালু; চতুর্থত, নিয়োগ এজেন্ট রেজিস্ট্রি ও অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা শক্ত করা; পঞ্চমত, দূতাবাস‑হাইকমিশন পর্যায়ে নিয়মিত ডেলিগেশন ও লবিং বাড়ানো। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের ১৬ দেশে শ্রমবাজার সমপ্রসারণের উদ্যোগটি যদি কৌশলগতভাবে বাস্তবায়িত হয়, তা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ হতে পারে- কিন্তু সফলতার শর্ত হলো দক্ষতা উন্নয়ন, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া, কূটনৈতিক তৎপরতা ও গন্তব্যভিত্তিক আইনি সুরক্ষা। খসড়া সমঝোতা স্মারকগুলো চূড়ান্ত করে দ্রুত পাইলট চালু করতে না পরলে কাগজে থাকা এমওইউই থেকে যাবে এবং মাঠে কোনো পরিবর্তন দেখা যাবে না।