রহস্যময় অন্ধকার কোঠা ও গুপ্তধনের লোককথা ঘিরে চাঞ্চল্য

এফএনএস (জুলফিকার আলী; কলারোয়া, সাতক্ষীরা) : | প্রকাশ: ৩০ মে, ২০২৬, ০৮:৩১ পিএম
রহস্যময় অন্ধকার কোঠা ও গুপ্তধনের লোককথা ঘিরে চাঞ্চল্য

সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী এক ঐতিহাসিক জনপদ সোনাবাড়িয়া। প্রায় দুই শত বছর আগের গোটা সোনাবাড়িয়াজুড়ে আজও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে জমিদার শাসনের নানা প্রাচীন নিদর্শন। আর এই ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় ধারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘সোনাবাড়িয়া মঠ মন্দির’। প্রায় ৬০ ফুট উঁচু, টেরাকোটা ফলক খচিত এই শ্যামসুন্দর মন্দিরটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। তবে যথাযথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি এখন চরম জরাজীর্ণ। দ্রুত কোনো পদক্ষেপ না নিলে এর অবশিষ্ট অংশটুকুও চিরতরে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

পুকুরের 'টাকার মেঠে' ও সুরঙ্গ রহস্য

এই মঠ মন্দিরকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে কিছু রোমাঞ্চকর ও গা ছমছমে রহস্য। এলাকার প্রবীণদের দাবি, মন্দিরের সামনের বিশাল পুকুরটিতে একটি লোহার শিকল দিয়ে বাঁধা ‘টাকার মেঠে’ বা জালা (গুপ্তধনের পাত্র) ছিল। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার রাতে ওই মেঠে থেকে টাকাগুলো বের হয়ে পুকুরের পানিতে কিলবিল করে ভাসতো, যা তৎকালীন সময়ে অনেকেই নিজ চোখে দেখেছেন। এ ছাড়াও লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, পুকুরের মাঝ বরাবর একটি গোপন সুরঙ্গ পথ ছিল, যা দিয়ে সরাসরি মঠ মন্দিরের ভেতরে যাতায়াত করা যেত।

আশ্চর্য অন্ধকার কোঠা ও স্বয়ংক্রিয় কষ্টিপাথর

মন্দিরের ভেতরে রয়েছে এক রহস্যময় কক্ষ, যা স্থানীয়দের কাছে ‘অন্ধকারা কোঠা’ নামে পরিচিত। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, একসাথে ১০টি টর্চ লাইট জ্বালালেও সেই কোঠার ভেতরের অন্ধকার দূর করা যেত না; আলোর তীব্রতা ভেদ করে সেখানে শুধু ঘুটঘুটে অন্ধকারই দেখা যেত। তবে ওই কোঠার ভেতরে আসলে কী ছিল, তা আজও এক রহস্য।

প্রবীণরা জানান, ওই কোঠার মধ্যে একটি অলৌকিক কষ্টিপাথর ছিল, যা প্রতি শনি ও মঙ্গলবারে আপনা-আপনি ঘুরতো। আর এই অলৌকিক দৃশ্য দেখতে ও পূজা করতে তখন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ভিড় জমাতেন। ধারণা করা হয়, কোনো কারণে ওই কোঠার পবিত্রতা নষ্ট হওয়ায় অলৌকিক কষ্টিপাথরটি শিকল কেটে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুকুরে পড়ে যায়। বর্তমানে সেই শিকলের মাত্র দুটি আংটা বা কড়া মন্দিরের কোঠায় ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। স্থানীয় অনেকেরই বিশ্বাস, সেই ‘টাকার মেঠে’ বা গুপ্তধনের পাত্রটি আজও পুকুরের তলদেশে লুকিয়ে আছে।

ইতিহাস ও অলৌকিক জনশ্রুতি

বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়, বাংলা ১২০৮ সালে রানী রাশমনি এই মঠ মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। তবে এই মঠ মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে রয়েছে নানা রোমাঞ্চকর অলৌকিক জনশ্রুতি। প্রচলিত আছে, সোনাবাড়িয়ার এক বেলগাছ তলায় রাতের আঁধারে মাটি ফুঁড়ে একাধিক শিব মূর্তি বের হয়েছিল। পরবর্তীতে রানী রাশমনি স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে স্নানের সময় নদী থেকে একটি ভাসমান পাথরের শিবমূর্তি উদ্ধার করেন এবং এই অলৌকিক ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতেই তিনি এই মঠ মন্দিরটি নির্মাণ করেন।

স্থাপত্যশৈলী ও কাঠামোগত সৌন্দর্য

আম, কাঁঠাল, নারকেল, মেহগনি, সেগুন ও দেবদারু গাছের বাগান দিয়ে ঘেরা প্রায় ১৫ একর জমির ওপর অবস্থিত এই মন্দির প্রাঙ্গণ। মূল মন্দিরটির দৈর্ঘ্য ২০ ফুট এবং প্রস্থ ১৫ ফুট। বিশালাকৃতির এই মঠ মন্দিরটি তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট পাতলা ইট ও চুন-সুরকি দিয়ে। এর দেয়ালজুড়ে রয়েছে নজরকাড়া টেরাকোটা ফলকের কারুকাজ। মন্দিরের সামনে রয়েছে একটি বিশাল পুকুর। পুকুরের পাশ দিয়ে ভেতরে ঢোকার জন্য ছিল একটি বড় তোরণ, যার ওপর নির্মিত হয়েছিল নহবতখানা। মন্দিরের পূর্ব পাশ দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা ১২টি ঘরে একসময় ১২টি শিবলিঙ্গ ছিল। এ ছাড়াও মূল মঠ মন্দিরের দোতলায় ঝুলন্ত দোলনায় থাকত সোনার তৈরি রাধাকৃষ্ণের মূর্তি।

বৌদ্ধ ধর্মের সংযোগ ও ভিন্নমত

মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে এলাকার প্রবীণদের কাছ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও চমৎকার একটি তথ্য পাওয়া যায়। অনেকের মতে, প্রাচীনকালে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে গৌতম বুদ্ধের অনুসারীরা এখানে প্রথম একটি মঠ বা উপাসনালয় তৈরি করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে এই অঞ্চলে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসারে সুবিধা করতে না পেরে তারা সোনাবাড়িয়া ত্যাগ করেন। এরপর মঠটি বেশ কিছুকাল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। বহু বছর পর সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এই পরিত্যক্ত কাঠামোটি পুনরায় নির্মাণ ও সংস্কার করে এটিকে মন্দিরে রূপান্তরিত করেন।

বর্তমান দশা ও জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা

কালের বিবর্তনে এবং যথাযথ যত্নের অভাবে হারিয়ে গেছে মন্দিরের সেই জৌলুস। চুরি হয়ে গেছে মূল্যবান কষ্টিপাথর ও সোনার মূর্তি। ধসে পড়েছে নহবতখানাসহ অনেক কক্ষ। বর্তমানে দেয়ালের টেরাকোটা খসে পড়ছে এবং পুরো ভবনটিই চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

এলাকাবাসী ও ইতিহাস সচেতন মহলের দাবি, দক্ষিণবঙ্গের এই অনন্য প্রাচীন স্থাপত্য ও পর্যটন সম্ভাবনাকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এই ঐতিহাসিক মঠ মন্দিরটি রক্ষার্থে ও এর রহস্য উদ্ঘাটনে অতি দ্রুত সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসকের জোরালো হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এখনই সংস্কার করা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সোনাবাড়িয়ার এই গৌরবময় ইতিহাস কেবলই রূপকথা হয়ে থাকবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে