রোদ-বৃষ্টির আলোছায়ায় দেড় হাজার বছর

ইতিহাসের খোঁজে ভরত ভায়নার দেউল

এফএনএস (এস.এম. শহিদুল ইসলাম; সাতক্ষীরা) : | প্রকাশ: ৩০ মে, ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম
ইতিহাসের খোঁজে ভরত ভায়নার দেউল

জ্যৈষ্ঠের এক আলো ঝলমলে তপ্ত সকাল। ঈদুল আজহার আনন্দের রেশ তখনো কাটে নি। নাগরিক কোলাহল আর দৈনিকের ব্যস্ততা পেছনে ফেলে মন ব্যাকুল হয়ে উঠেছিল নতুন কোনো ইতিহাসের খোঁজে। ছুটির অলস প্রহরে আশেপাশের চেনা-অচেনা সুন্দর আর ঐতিহাসিক স্থানগুলো ছুঁয়ে দেখা আমার দীর্ঘদিনের এক মায়াবী শখ। সেই ভালোলাগার টানেই ঈদের পরের দিন, এক পবিত্র শুক্রবারের সকালে আমরা রওনা হলাম দক্ষিণবঙ্গের এক অনন্য ও রহস্যময় পুরাকীর্তি-'ভরত ভায়নার দেউল' দর্শনে, যা স্থানীয় মানুষের হৃদয়ে 'ভরত রাজার দেউল' নামে অমর হয়ে আছে।

আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল সাতক্ষীরা থেকে। খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের পিচঢালা পথ ধরে, চুকনগর পেরিয়ে যখন আমাদের গাড়ি ভায়না বাজারে পৌঁছাল, তখন চারপাশের গ্রাম্য মসজিদে জুম্মার আজান ধ্বনিত হচ্ছে। তপ্ত রোদের ক্লান্তি মেখে যখন দেউল প্রাঙ্গণে পা রাখলাম, তখন সেখানে নামাজের পবিত্র প্রস্তুতি চলছিল। দায়িত্বরত নিরাপত্তাকর্মী আমাদের বিনীতভাবে অনুরোধ করলেন নামাজের পর আসতে।

কিছু সময় অপেক্ষার পর, নামাজ শেষে মাত্র দশ টাকার টিকিট কেটে আমরা প্রবেশ করলাম ইতিহাসের এক প্রাচীন ও নিস্তব্ধ সাম্রাজ্যে। প্রবেশদ্বার গলে ভেতরে পা রাখতেই বাম পাশে চোখ জুড়িয়ে দিল এক বিশাল, প্রাচীন বটবৃক্ষ। তার সুশীতল ছায়ার নিচে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি তথ্য বোর্ড। সেখান থেকে ইতিহাসের প্রথম পাঠটুকু চুকিয়ে, ক্যামেরার ফ্রেমে কিছু স্মৃতি বন্দি করে আমরা ধীরে ধীরে পুরো দেউল প্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করতে লাগলাম। একসময় পা বাড়ালাম দেউলের শীর্ষের দিকে।

আমাদের মতো সেখানে আরও অনেক উৎসুক মানুষের সমাগম ঘটেছিল। কেউ এসেছিলেন সপরিবারে আনন্দের ক্ষণ ভাগ করে নিতে, কেউবা বন্ধুদের সদলবলে আড্ডায় মুখর। বর্তমান যুগের ডিজিটাল হাওয়াও লেগেছিল সেখানে; কয়েকজন ভিডিও কনটেন্ট নির্মাতা ব্যস্ত ছিলেন ভিডিও ধারণে, কেউবা ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করছিলেন দেউলের প্রাচীন রূপ।

কিন্তু প্রকৃতির মন বোঝা বড় দায়। হঠাৎ করেই দুপুরের সেই তপ্ত নীল আকাশ কালো মেঘে আঁধার হয়ে এলো। জ্যৈষ্ঠের চাদর ফুঁড়ে আচমকা ধেয়ে এলো কালবৈশাখী ঝড়, আর তার সাথে প্রবল বৃষ্টি। দেউলের শীর্ষ থেকে তড়িঘড়ি করে নেমে আমরা আশ্রয় নিলাম কাছের একটি দোকানে। ততক্ষণে আমরা একদম কাকভেজা হয়ে গিয়েছি। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ চলল দু'দফায়। মেঘের আড়ালে সূর্য কখন যে লুকিয়ে গেল টের পাইনি, মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি চারপাশ জুড়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। ঝড় থামলেও ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি তখনো থামেনি। অগত্যা সেই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই আমাদের ফেরার পথ ধরতে হলো। রোদ আর বৃষ্টির এই আলোছায়ার খেলা ভ্রমণটিতে এক অন্যরকম রোমাঞ্চ যোগ করেছিল।

খুলনা ও যশোর সীমান্তের ঠিক কোল ঘেঁষে, যশোর জেলার কেশবপুর উপজেলার ভদ্রা নদীর পশ্চিম তীরে শান্ত-স্নিগ্ধ এক লোকালয় এই ভরত ভায়না গ্রাম। কেশবপুর সদর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় আঠারো কিলোমিটার দূরে এই নিভৃত গ্রামেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আনুমানিক দেড় হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো এই পুরাকীর্তি। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন এক টুকরো পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার সবুজ কাননের বুকে জেগে আছে।

স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ভরত রাজার নাম জড়িয়ে থাকলেও, প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা এখানকার প্রাচীন ইট ও প্রাপ্ত বিভিন্ন পোড়ামাটির মূর্তি গবেষণা করে নিশ্চিত হয়েছেন যে, এটি মূলত খ্রিষ্টীয় ৩য় থেকে ৬ষ্ঠ শতকের তথা আদি ঐতিহাসিক যুগের একটি প্রাচীন বৌদ্ধমন্দির। খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, দেশে আদি ঐতিহাসিক যুগের এমন স্থাপনা সত্যিই বিরল। তাঁর জানামতে, ভরত ভায়না মন্দিরই হচ্ছে সমগ্র দক্ষিণবঙ্গের একমাত্র আদি ঐতিহাসিক যুগের প্রাচীন নিদর্শন।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, ১৯২২ সালে তৎকালীন ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ এই রহস্যময় ঢিবিটি সংরক্ষণের আওতাভুক্ত করে। এর পরের বছর, ১৯২৩ সালে প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক কাশিনাথ দীক্ষিত এই ঢিবিতে সূক্ষ্ম জরিপ পরিচালনা করেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন, এই মাটির ঢিবির নিচে লুকিয়ে আছে পঞ্চম শতকের এক প্রাচীন বৌদ্ধমন্দির, যা হয়তো চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন-সাং বর্ণিত সমতটের সেই বিখ্যাত ত্রিশটি সংঘারামেরই একটি। সে সময় তিনি এর সুরক্ষায় কিছু সীমানা পিলারও স্থাপন করেছিলেন, যদিও পরবর্তী সময়ে সুযোগসন্ধানী মানুষের লোভের গ্রাসে সেই সব মূল্যবান প্রাচীন সম্পদ লুণ্ঠিত হয়ে যায়।

অনুমিত এই মূল মন্দিরটি ১ একর ২৯ শতক জমির ওপর বিস্তৃত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৮৫ সালে প্রথম এই ঢিবিতে খননকাজ শুরু করে। এর এক দশক পর, ১৯৯৫-৯৬ সালে পুনরায় এখানে ইতিহাসের গভীর অনুসন্ধান চালানো হয়। তখন থেকে শুরু করে, ১৯৯৬-৯৭ সালের বিরতি বাদে ২০০০-০১ সাল পর্যন্ত প্রতি মৌসুমে এখানে খননকাজ অব্যাহত থাকে, যা আজ অব্দি সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। দীর্ঘদিনের এই খননকাজের ফলে একটি প্রাচীন স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষের অংশবিশেষ উন্মোচিত হয়েছে। তা দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে, স্থাপনাটির মূল উপরি-কাঠামোটি কালের আবর্তে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে যে দৃশ্যমান কাঠামোটি পর্যটকদের মুগ্ধ করে, তা মূলত বিনষ্ট হওয়া সেই প্রাচীন অট্টালিকার এক বিশাল ভিত্তি বা উঁচু मंच।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের করা নকশা ও স্কেচ থেকে এই মন্দিরের এক বিস্ময়কর স্থাপত্যশৈলীর পরিচয় মেলে। এর পুরো অবয়ব জুড়ে মোট ৮২টি বদ্ধ প্রকোষ্ঠ ধাপে ধাপে ওপরের দিকে উঠে গেছে। ঢিবির ঠিক শীর্ষর দেয়াল প্রায় নয় ফুট প্রশস্ত, যার ভেতরে রয়েছে চারপাশের বর্গাকৃতির চারটি প্রকোষ্ঠ। ধারণা করা হয়, মূল অট্টালিকার প্রধান কক্ষটি এই প্রকোষ্ঠগুলোর ওপরই নির্মাণ করা হয়েছিল। এর ঠিক নিচের অর্থাৎ দ্বিতীয় ধাপের দেয়ালটি তিন ফুট চওড়া এবং এখানে রয়েছে বিভিন্ন আকৃতির ১৯টি প্রকোষ্ঠ। আবার পরবর্তী ধাপে রয়েছে ১৮টি প্রকোষ্ঠ। সাড়ে তিন ফুট চওড়া দেয়ালের চতুর্থ ধাপটিতে আবার ১৯টি বদ্ধ প্রকোষ্ঠের দেখা মেলে। আর একদম শেষ ধাপে ১০ থেকে ১৩ ফুট চওড়া দেয়ালের ভেতর লুকিয়ে আছে ২২টি বদ্ধ প্রকোষ্ঠ। এই প্রকোষ্ঠগুলোর ঠিক নিচেই রয়েছে ভক্ত ও পরিব্রাজকদের জন্য তৈরি প্রায় দশ ফুট চওড়া একটি সুদীর্ঘ প্রদক্ষিণ পথ। মূল মন্দিরের চারদিকে চারটি প্রবেশপথ রয়েছে, যার অবয়বে এখন পর্যন্ত সাতটি প্রকোষ্ঠ উন্মোচিত হয়েছে। তবে এর অনন্য গঠনশৈলী বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করেন, পূর্ব দিকটাই ছিল এই মন্দিরের মূল প্রবেশদ্বার।

এই মন্দিরের আরেকটি সবচেয়ে বড় বিস্ময় লুকিয়ে আছে এর ইটের মাঝে। এর নির্মাণে যে বিশাল আকৃতির ইট ব্যবহার করা হয়েছে, তার পরিমাপ দৈর্ঘ্যে ৩৬ সেন্টিমিটার, প্রস্থে ২৬ সেন্টিমিটার এবং পুরুত্বে ৬ সেন্টিমিটার। এত বড় ও ভারী ইট এই অঞ্চলের আর কোনো প্রাচীন পুরাকীর্তিতে বা ঐতিহাসিক নিদর্শনে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়নি। কেবল এই বিশাল স্থাপত্যিক ধ্বংসাবশেষই নয়, এই ঢিবির বুক চিরে উদ্ধার করা হয়েছে ইতিহাসের আরও অনেক অমূল্য স্মারক। যার মধ্যে রয়েছে গুপ্তযুগের একটি সুনিপুণ পোড়ামাটির মাথা, পোড়ামাটির মানুষের হাত ও পায়ের কয়েকটি ভগ্ন টুকরো, কয়েকটি মাটির প্রাচীন প্রদীপ, অলংকৃত ইটের টুকরো, প্রাচীন মানুষের পদচিহ্ন-সংবলিত দুটি অনন্য ইটের টুকরো এবং একটি মাটির ক্ষুদ্র পাত্র। কালের ধুলোবালি মেখে টিকে থাকা এই ঐতিহাসিক সম্পদগুলো বর্তমানে খুলনা বিভাগীয় জাদুঘরে পরম যত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। যাঁরা যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি মুছে ইতিহাসের এই প্রাচীন আঙিনায় হারিয়ে যেতে চান, তাঁদের জন্য ভরত ভায়না যাওয়ার পথটি বেশ সহজ ও মনোরম। খুলনা নগরের দৌলতপুর থেকে ডুমুরিয়ার শাহপুর বাজার হয়ে সামনে মিকশিমিল সড়ক ধরে এগিয়ে, ভদ্রা নদীর সেতু পার হয়ে কিছুদূর গেলেই চোখে পড়বে ছায়া-সুনিবিড় ভরত ভায়না গ্রাম। অসংখ্য গাছগাছালি, বাঁশবাগান আর পাখির কলরবে মুখরিত মেঠো রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকলেই একসময় দূর থেকে নজরে পড়ে দেউলের চূড়া। আবার খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের খর্ণিয়া বা চুকনগর বাসস্ট্যান্ড হয়েও খুব সহজে লোকাল বাহনে চড়ে এখানে পৌঁছানো যায়। সময়ের বিবর্তনে আর মানুষের অবহেলায় ভরত ভায়না দেউল আজ হয়তো তার পূর্বের জৌলুস হারিয়েছে, কিন্তু এর প্রতিটি প্রাচীন ইটের ভাঁজে, বটবৃক্ষের পাতার মর্মরে আজও ফিসফিস করে কথা বলে ওঠে দেড় হাজার বছরের পুরোনো এক হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা। রোদ-ঝড়-বৃষ্টির সেই দিনে ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এই অনুভূতি আমার স্মৃতিতে অমলিন হয়ে থাকবে চিরকাল।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে