দেশেই টিকা উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ফলে বর্তমানে বিদেশ থেকে টিকা আমদানির প্রায় অর্ধেক খরচে স্থানীয়ভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। তাতে সরকারের ব্যয় কমার পাশাপাশি টিকার সহজলভ্যতা বাড়বে। একই সাথে তৈরি হবে রপ্তানির নতুন সুযোগ। বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে ডেঙ্গু, জলাতঙ্ক, হাম ও সাপের কামড়-প্রতিরোধী টিকা উৎপাদনের প্রস্তুতত চলছে। পাশাপাশি জোরদার করা হয়েছে বিশ্ববাজারে প্রবেশের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ম্যাচিউরিটি সনদ অর্জনে সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও। কারণ এখনো বাংলাদেশে টিকা উৎপাদন ও রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব এখনো বড় বাধা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে বিগত ২০১১ সালে বাণিজ্যিকভাবে টিকা উৎপাদন শুরু হয়। ৩টি ওষুধ কোম্পানি বর্তমানে উৎপাদন করছে মানব ও পশুচিকিৎসায় ব্যবহৃত ১৫ থেকে ১৬ ধরনের টিকা। তার মধ্যে একটি কোম্পানি কয়েকটি আফ্রিকান দেশে সীমিত পরিসরে টিকা রপ্তানি করছে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সনদ না থাকায় বড় পরিসরে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না। ওই সনদ কোনো দেশের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, মান নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু দেশের ওষুধ ও টিকা খাতের নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এখনও এই সনদ অর্জন করতে পারেনি। ফলে বাংলাদেশে উৎপাদিত টিকার জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রি-কোয়ালিফিকেশন আবেদনও গ্রহণ করা হয় না। তাতে সীমিত হয়ে আছে আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত বাজারে টিকা রপ্তানির সুযোগ।
সূত্র জানায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সনদ একটি দেশের বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রক সক্ষমতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। সনদ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিবেচনা করা হয়। তার মধ্যে রয়েছে ভ্যাকসিন নিবন্ধন, ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল তদারকি, বাজার মনিটরিং, মান নিয়ন্ত্রণ, পরীক্ষাগার সক্ষমতা, আইনি কাঠামো, লজিস্টিক সহায়তা, জ্ঞান ব্যবস্থাপনা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। ওসব বিষয়ে দেশে কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হলেও এখনো ঘাটতি রয়েছে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, গুণগত নিশ্চায়ন ও সমন্বিত তদারকিতে। কিন্তু উন্নত দেশগুলোর মতো বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সক্ষমতা তৈরি না হলে ওই সনদ পাওয়া সম্ভব নয়।
সূত্র আরো জানায়, দেশীয়ভাবে টিকা উৎপাদনে নতুন একটি প্রকল্প নেয়া হয়েছে। বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। তাতে ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রকল্পটি চালু হলে বছরে ৯০ লাখ থেকে এক কোটি ভায়াল টিকা উৎপাদন সম্ভব হবে। বর্তমানে দেশে ডেঙ্গু, জলাতঙ্ক, হাম ও সাপের কামড়ের প্রতিষেধকের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৫০ লাখ ডোজ। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সনদ অর্জন করতে পারলে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের টিকা রপ্তানি পাঁচ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
এদিকে এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. এ সামাদ মৃধা জানান, দেশে টিকা উৎপাদনের ফলে স্থানীয় চাহিদা পূরণের পর অতিরিক্ত টিকা রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে। সরকার বিদেশ থেকে যে দামে ওসব টিকা আমদানি করে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা গেলে প্রায় অর্ধেক দামে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে জরুরি ভিত্তিতে নতুন টিকা উৎপাদন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ডেঙ্গু, জলাতঙ্ক, হাম ও সাপের কামড় বর্তমানে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগ। আগামী এক বছরের মধ্যে ওই চার ধরনের টিকার উৎপাদন শুরু করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। আশা করা যায় আগামী বছরের জুনের মধ্যে সরকারকে টিকা সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানান, সরকার আন্তর্জাতিক মানের টিকা উৎপাদনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এমএল-৩ সনদ অর্জনের প্রচেষ্টাও চলমান রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিরা শিগগিরই ঢাকায় আসবে। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাজ এগিয়ে নেয়া হবে। ইতিমধ্যে মুন্সীগঞ্জে একটি ভ্যাকসিন উৎপাদন প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। বর্তমানে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। পূর্ণকালীন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ হলে কাজ আরো দ্রুত এগোবে।