বাংলাদেশের নদীমাতৃক ভূগোল নৌপথকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থায় পরিণত করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক নৌযান শুমারির প্রাথমিক তথ্য উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে এনেছে। দেশে প্রায় ২ লাখ ৪৪ হাজার ইঞ্জিনচালিত নৌযান থাকলেও নিবন্ধিত রয়েছে মাত্র ২২ হাজারের কিছু বেশি। অর্থাৎ ৯০ শতাংশেরও বেশি নৌযান কার্যত নিবন্ধনের বাইরে থেকে চলাচল করছে। এটি শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতার বিষয় নয়; বরং নৌনিরাপত্তা, যাত্রী সুরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি। নিবন্ধনহীন নৌযান মানেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, দক্ষ চালক ও প্রয়োজনীয় তদারকি ছাড়া চলাচল। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। দেশের নৌপথে প্রায়ই সংঘর্ষ, ডুবি ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। কিন্তু এসব ঘটনার পর সাময়িক আলোচনা হলেও দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার খুব কমই দেখা যায়। সম্প্রতি সদরঘাটে দুটি যাত্রীবাহী লঞ্চের সংঘর্ষে প্রাণহানির পর সরকারের নড়েচড়ে বসা প্রমাণ করে, বড় দুর্ঘটনা না ঘটলে এই খাত অনেক সময় উপেক্ষিতই থেকে যায়। নৌযান নিবন্ধনের উদ্দেশ্য শুধু কাগজপত্র সংরক্ষণ নয়; বরং প্রতিটি নৌযানের নকশা, ধারণক্ষমতা ও নিরাপত্তা মান যাচাই করা। একটি নৌযান নদীতে চলাচলের উপযোগী কি না, সেটি নিশ্চিত করার জন্যই এই প্রক্রিয়া। অথচ বিপুলসংখ্যক নৌযান বছরের পর বছর এই ব্যবস্থার বাইরে পরিচালিত হচ্ছে। এটি প্রশাসনিক তদারকির সীমাবদ্ধতা ও আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে। অন্যদিকে, এত বিপুলসংখ্যক নৌযান নিবন্ধনের বাইরে থাকায় সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। নৌখাত দেশের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক যোগাযোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর ব্যবস্থাপনায় এখনও পর্যাপ্ত আধুনিকায়ন হয়নি। তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণের জন্য নৌযান শুমারি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও, এর কার্যকর ফল নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। এখন প্রয়োজন নিবন্ধনবিহীন নৌযানগুলোকে দ্রুত আইনি কাঠামোর আওতায় আনা, নিরাপত্তা মানদণ্ড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা এবং নিয়মিত পরিদর্শন ব্যবস্থা জোরদার করা। একই সঙ্গে নৌযান মালিকদের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ ও স্বচ্ছ করতে হবে। দুর্ঘটনার পর প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা নয়, বরং প্রতিরোধমূলক ও পরিকল্পিত তদারকিই হতে পারে স্থায়ী সমাধান। বাংলাদেশের নৌপথ শুধু ঐতিহ্যের অংশ নয়, এটি লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তাই নিরাপদ, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও জবাবদিহিমূলক নৌব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।