হাওরের ফসল রক্ষায় নদী খননের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
| আপডেট: ৭ জুন, ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম | প্রকাশ: ৭ জুন, ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম
হাওরের ফসল রক্ষায় নদী খননের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার

আগাম বন্যা থেকে হাওরের ফসল রক্ষায় নদী খননের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। ‘হাওর অঞ্চলের আগাম বন্যা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ওসব নদী খনন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় সুরমা, বাউলাই, ধনু, ঘোড়াউত্রা, আপার মেঘনা, পুরাতন সুরমা, দাড়াইন, চামতি, সোমেশ্বরী, কাউনাই, বাউলাই-পাটনাই, গাং ও আবুয়া নদী খনন করা হবে। তার মধ্যে সুনামগঞ্জে ৮টি এবং কিশোরগঞ্জে ৫টি রয়েছে। প্রস্তাবিত ওই প্রকল্পে এক হাজার ৪২৯ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রতি ঘনমিটার মাটি অপসারণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৯৩ টাকা। ওই প্রকল্পের আওতায় ১৩টি নদী ড্রেজিং, খাল পুনঃখনন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। তার মাধ্যমে আগাম বন্যা থেকে সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হবে এক লাখ ৬৫ হাজার ২৩০ হেক্টর কৃষিজমি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রতি বছরই দেশের হাওর অধ্যুষিত এলাকায় আগাম বন্যা ও বাঁধ ভেঙে শত শত হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে যায়। ফলে প্রতি বছরই ফসল হারিয়ে আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে বিপুলসংখ্যক কৃষক। এমন পরিস্থিতিতে সরকার আগাম বন্যা থেকে কৃষকের ধান রক্ষায় হাওর অঞ্চলের ১৩টি নদী ড্রেজিংয়ের প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। বর্তমান পর্যায়ে ড্রেজিংয়ের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিনটি রিভার সিস্টেমও খনন করা হবে। সেগুলো হলো, সুরমা-বাউলাই-আপার মেঘনা রিভার সিস্টেম, পুরাতন সুরমা রিভার সিস্টেম ও আবুয়া-পাটনাই-কাউনাই রিভার সিস্টেম। ওসব সিস্টেমের আওতায় ১৩টি নদী ড্রেজিং, খাল পুনঃখনন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এক লাখ ৬৫ হাজার ২৩০ হেক্টর কৃষিজমি সুরক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার পানি নিষ্কাশনে বিলম্বে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নির্মিত বোরো ফসল রক্ষাকারী ডুবন্ত বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। পাশাপাশি প্রতিবছরই হাওরের পানি নিষ্কাশন বিলম্বের কারণে হাওরে বোরো ধানের বীজতলা প্রস্তুত ও চারা রোপণের সময়ও কমে আসে। সমপ্রতি পরিকল্পনা কমিশনে ‘হাওর অঞ্চলের আগাম বন্যা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন (১ম পর্যায়)’ প্রকল্পটি পর্যালোচনা করা হয়। প্রস্তাবিত ওই প্রকল্পটি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) বাস্তবায়ন করবে। আগামী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার ১৬ উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হবে। বর্তমানে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীসহ অন্যান্য নদীর তলদেশ পলি ও বালু জমে ভরাট হয়ে কমে গেছে পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা। তাতে আকস্মিক বন্যার পানি নিষ্কাশন হতে অতিরিক্ত সময় লাগছে। আর আকস্মিক বন্যার পানি নিষ্কাশনে বিলম্বের ফলে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নির্মিত বোরো ফসল রক্ষাকারী ডুবন্ত বাঁধ ভেঙে হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এখন প্রকল্পের আওতায় ৩০৩ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং বাবদ এক হাজার ২৪৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা খরচ ধরা হয়েছে।  প্রকল্পের আওতায় এক হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৫ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, প্রতিবেশী দেশভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত হয়। পাহাড়ি এলাকার ওই বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি খুব দ্রুত সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকায় ধেয়ে আসে। আর তাতেই প্রতিবছর আগাম বন্যায় হাওরের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে নষ্ট হওয়ার শঙ্কা থাকে। কিন্তু প্রস্তাাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে হাওরের নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করা হবে। ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান আগাম বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে।

এদিকে এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (সুনামগঞ্জ পওর বিভাগ-২) মো. ইমদাদুল হক জানান, হাওরের ১৩টি নদী ড্রেজিং করলে আগাম বন্যা থেকে কৃষকের ধান রক্ষা পাবে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলাকে বাংলাদেশের শস্যভান্ডার বলা হয়। ওই এলাকার অর্থনীতি মূলত ধান ও মাছ উৎপাদননির্ভর। বাংলাদেশের সুনামগঞ্জ জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্য। ওই অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর বৃষ্টি হয়। আর ওই বৃষ্টির পানি ভারতের বিভিন্ন নদী দিয়ে সুনামগঞ্জে প্রবেশ করে এবং সুরমা ও কুশিয়ারা নদী হয়ে মেঘনায় পতিত হয়। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীসহ অন্যান্য নদীর তলদেশ পলি ও বালু জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা কমে গেছে। তাতে ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যার পানি নিষ্কাশন হতে অতিরিক্ত সময় লাগে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে