একসময় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রাহকদের ভিড়ে মুখর থাকত সৈয়দপুরের পুরাতন টেলিফোন অফিস। ল্যান্ডফোন সংযোগ নেওয়া, ট্রাঙ্ককল বুকিং, বিল পরিশোধ কিংবা নতুন সংযোগের আবেদন নিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ ভিড় জমাতেন সেখানে। কিন্তু প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ও মোবাইল ফোনের বিস্তারের ফলে সেই ব্যস্ততা এখন শুধুই স্মৃতি। বর্তমানে ভবনটি প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তবে এখন নতুন অফিস করা হয়েছে রংপুর রোডে। পুরাতন অফিসটি এখন অনেকের কাছে একটি ‘ভুতুড়ে অফিস’ হিসেবেই পরিচিত।
সৈয়দপুর শহরের ঐতিহ্যবাহী এই টেলিফোন অফিস একসময় উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ কেন্দ্র ছিল। মোবাইল ফোনের প্রচলনের আগে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল ল্যান্ডফোন। ফলে অফিসটিতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। গ্রাহকদের দীর্ঘ সারি ছিল নিত্যদিনের দৃশ্য। স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, নব্বইয়ের দশক এবং দুই হাজার সালের শুরুর দিকে একটি টেলিফোন সংযোগ পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হতো। তখন এই অফিস ছিল মানুষের যোগাযোগের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে মোবাইল প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা জনপ্রিয় হয়ে ওঠায় ল্যান্ডফোনের ব্যবহার দ্রুত কমে যায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরনো ভবনের অনেক কক্ষ এখন তালাবদ্ধ। ভবনের দেয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটল, জানালার কাচ ভাঙা এবং চারপাশে আগাছা জন্মেছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় ভবনটির সৌন্দর্যও হারিয়ে গেছে। সন্ধ্যার পর এলাকাটি প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ে। তবে এখন কিছু পরিবার এখানে বসবাস করছে। তারা কোথাকার লোক,কারা এদের ভাড়া দিয়েছে, কত টাকাই বা মাসিক ভাড়া,ভাড়ার টাকা কে নেয় তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সচেতন মহলে। এক ব্যবসায়ী বলেন,একসময় এই অফিসে কাজের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো। এখন মাঝে মাঝে কেউ আসে, আবার দ্রুত চলে যায়। ভবনটি দেখে মনে হয় বহুদিনের পরিত্যক্ত কোনো স্থাপনা। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে থাকা ভবনটি সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ভবনটিকে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা কেন্দ্র, ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অথবা সরকারি বহুমুখী সেবা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। টেলিযোগাযোগ খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবার ব্যাপক বিস্তারের কারণে ল্যান্ডফোনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তবে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় পুরনো টেলিফোন ভবনগুলো সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
একসময় মানুষের কোলাহলে মুখরিত সৈয়দপুরের পুরাতন টেলিফোন অফিস আজ নীরবতার সাক্ষী। সময়ের পরিবর্তনে হারিয়ে যাওয়া এক গৌরবময় অধ্যায়ের স্মৃতিচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ভবনটি। যথাযথ উদ্যোগ না নিলে অচিরেই হয়তো ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটিও হারিয়ে যাবে অবহেলার অতলে।