স্বাস্থ্যসেবা একটি রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর দীর্ঘস্থায়ী সংকট বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার অন্যতম বড় দুর্বলতা হিসেবে রয়ে গেছে। জাতীয় সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের ৯ হাজার ৪০৭টি, নার্সের ৫ হাজার ৩২টি এবং স্বাস্থ্যকর্মীর ৮ হাজার ৭৮৪টি পদ শূন্য রয়েছে। এসব পরিসংখ্যান কেবল প্রশাসনিক ঘাটতির চিত্র নয়; বরং স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের বাস্তব দুর্ভোগের প্রতিফলন। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে জনবল সংকট সবচেয়ে প্রকট। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের প্রায় অর্ধেক পদ শূন্য। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অবস্থাও একই রকম। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের বাধ্য হয়ে জেলা বা বিভাগীয় শহরে যেতে হচ্ছে, যা সময় ও অর্থ-উভয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে, সারা দেশে ১৪ হাজার ৪৬০টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালুর তথ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। গত এক দশকে তৃণমূল পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে এসব ক্লিনিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তবে অবকাঠামো থাকলেই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয় না; প্রয়োজন পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী। জনবল সংকট অব্যাহত থাকলে এই বিশাল নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছানো কঠিন হবে। সংসদে ট্যানারির বিষাক্ত বর্জ্য দিয়ে তৈরি পোলট্রি ও ফিশ ফিডের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিষাক্ত ক্রোমিয়াম খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের মতো জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে সরকারি স্বীকৃতি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নটিকে নতুন করে সামনে এনেছে। এটি কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়; পরিবেশ, শিল্প ও খাদ্য নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগের বিষয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংক্রামক রোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় সীমান্ত স্বাস্থ্য নজরদারি ও প্রস্তুতি জোরদারের উদ্যোগও সময়োপযোগী। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক মহামারি ও নতুন রোগের বিস্তার দেখিয়েছে, জনস্বাস্থ্য নিরাপত্তা এখন জাতীয় নিরাপত্তারই অংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ হলেও মূল চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে জনবল নিয়োগ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সেবার মান নিশ্চিত করা। দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা পদগুলো দ্রুত পূরণ, প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশ উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনে জবাবদিহি বাড়ানো ছাড়া পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি সম্ভব নয়। জনগণের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হলে অবকাঠামোর পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।