জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন, রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং উন্নয়ন কৌশলের প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটও সেই অর্থে নতুন সরকারের প্রথম বড় নীতিগত ঘোষণাপত্র। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহ, মানব উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর। সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশ গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডিও মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি দ্রুত সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা সহজ হবে না। জ্বালানি সংকট, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, দুর্বল বিনিয়োগ পরিবেশ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এই লক্ষ্য অর্জনের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে। বাজেটের ইতিবাচক দিক হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া। সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের অবস্থান প্রমাণ করে যে সরকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করতে আগ্রহী। একই সঙ্গে তরুণ উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ এবং সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে কর-সুবিধা ও প্রণোদনার উদ্যোগ ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনাময় বার্তা বহন করে। তবে উদ্বেগের জায়গাও কম নয়। প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি পূরণে সরকারকে ব্যাপক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি ও বিনিয়োগে প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করাও সহজ হবে না। চলমান অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহের চিত্র সেই আশঙ্কাকেই জোরালো করে। করের আওতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক হলেও টিআইএন বাধ্যতামূলক করা কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ও জনভোগান্তির বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড় এবং চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর শুল্ক কমানোর উদ্যোগ সাধারণ মানুষের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। অতএব, এই বাজেটের মূল পরীক্ষা হবে বাস্তবায়নে। ঘোষিত লক্ষ্য, সংস্কার এবং অগ্রাধিকারগুলো যদি দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথ সুগম হতে পারে। অন্যথায় উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলো কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা থেকে যাবে।