শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়; এগুলো পরিবেশ সচেতনতা, পরিকল্পিত উন্নয়ন এবং দায়িত্বশীল প্রশাসনেরও প্রতীক। সেই বিবেচনায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শহীদ রুদ্র সেন লেক’-এর অংশ ভরাট করে গাড়ির গ্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিষয়টি কেবল একটি অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি উন্নয়ন পরিকল্পনা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে বিপুল ব্যয়ে খনন করা এই লেক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম নান্দনিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীদের কাছে এটি যেমন আকর্ষণের কেন্দ্র, তেমনি একটি স্মৃতিবাহী স্থাপনাও। এমন একটি জলাধারের অংশ ভরাট এবং পাশের টিলার কিছু অংশ কাটার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগের কারণ। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এখন বিশ্বজুড়েই উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে আরও বেশি সংবেদনশীলতা প্রত্যাশিত। গ্যারেজ নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, নির্মাণাধীন স্থাপনাটিতে মাত্র ২২টি গাড়ি রাখা সম্ভব হবে, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন বহরে রয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি যানবাহন। ফলে প্রকল্পটি বাস্তব প্রয়োজন কতটা পূরণ করবে, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। যদি সত্যিই বিকল্প খালি জায়গা থেকে থাকে, তাহলে পরিবেশের ক্ষতি না করেই সমাধানের সুযোগ ছিল কি না, সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে। অবশ্য কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, কারিগরি নকশা কিংবা ব্যয়ের যৌক্তিকতা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও প্রশাসনের। তবে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, গণমাধ্যম কিংবা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের উত্থাপিত প্রশ্নকে বিরূপভাবে না দেখে তথ্যভিত্তিক ব্যাখ্যা প্রদানই হতে পারে আস্থা তৈরির সর্বোত্তম উপায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণমূলক ও পরিবেশবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা জরুরি। উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন প্রকৃতির ক্ষতি, সৌন্দর্যের বিনাশ কিংবা সম্পদের অপচয়ের কারণ না হয়। ‘শহীদ রুদ্র সেন লেক’কে ঘিরে যে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তা নিরসনে কর্তৃপক্ষের উচিত প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, ব্যয় এবং পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরা। স্বচ্ছতা ও যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্তই এ ধরনের বিতর্কের সর্বোত্তম সমাধান হতে পারে।