জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি শিক্ষা। সেই বিবেচনায় বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেটে শিক্ষা খাতে রেকর্ড বরাদ্দের প্রস্তাব নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষার জন্য এক লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা এবং আগামী পাঁচ বছরে তা জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা সরকারের অগ্রাধিকারকে স্পষ্ট করেছে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আসা শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের জন্য এটি আশাব্যঞ্জক বার্তা। প্রস্তাবিত বাজেটে কারিগরি শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা এবং তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শ্রমবাজারের চাহিদা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের বিকল্প নেই। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে পর্যায়ক্রমে কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা এবং শিক্ষা ও শিল্পখাতের মধ্যে সংযোগ তৈরির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু বরাদ্দের অঙ্ক বৃদ্ধি করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অনেক সময় উন্নয়ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও শিক্ষার গুণগত মানে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। অবকাঠামো নির্মাণ, যন্ত্রপাতি ক্রয় বা প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়ের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা, শিক্ষকের দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীর শেখার মানকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ শিক্ষার প্রকৃত উন্নয়ন নির্ভর করে শ্রেণিকক্ষে জ্ঞান অর্জনের পরিবেশ কতটা উন্নত হচ্ছে তার ওপর। একই সঙ্গে শিক্ষকদের জীবনমানের বিষয়টি উপেক্ষা করা যায় না। দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের অধিকাংশ শিক্ষার দায়িত্ব পালন করছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা। অথচ তাদের বেতন-ভাতা, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি ও কর্মপরিবেশ নিয়ে বাজেটে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। একজন শিক্ষক আর্থিক অনিশ্চয়তায় থাকলে শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রেকর্ড বরাদ্দ সত্ত্বেও শিক্ষা খাতে ব্যয় এখনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় কম। ইউনেস্কো জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয়ের সুপারিশ করলেও আমাদের প্রস্তাবিত বরাদ্দ সেই লক্ষ্যের অনেক নিচে রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সবশেষে বলা যায়, এবারের বাজেট শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে বরাদ্দকৃত অর্থ কতটা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে ব্যয় করা হচ্ছে তার ওপর। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগকে ব্যয় নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও জাতীয় উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করাই হবে সবচেয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।