ভাইরাল হওয়ার নেশা, সড়কে মৃত্যুর প্রতিযোগিতা

এফএনএস
| আপডেট: ২১ জুন, ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম | প্রকাশ: ২১ জুন, ২০২৬, ০৩:১৪ পিএম
ভাইরাল হওয়ার নেশা, সড়কে মৃত্যুর প্রতিযোগিতা

দেশের মহাসড়কগুলোতে বেপরোয়া গতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং দীর্ঘদিন ধরেই সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রবণতা নতুন ও উদ্বেগজনক মাত্রা পেয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভাইরাল’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বাস, মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনের গতির প্রতিযোগিতা ধারণ করে প্রচার করা হচ্ছে। এতে শুধু ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনই উৎসাহিত হচ্ছে না, বরং জননিরাপত্তাও মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ছে। ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে প্রতিনিয়ত এমন ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে, যেখানে দেখা যায় একাধিক বাস কিংবা মোটরসাইকেল বিপজ্জনক গতিতে প্রতিযোগিতা করছে। অনেক ক্ষেত্রে চালক বা সহকারীদের উৎসাহমূলক মন্তব্যও শোনা যায়। এসব ভিডিওতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি যেন বিনোদনের উপাদানে পরিণত হয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব কনটেন্ট বিপুল দর্শকপ্রিয়তা পাচ্ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে আর্থিক লাভেরও উৎস হয়ে উঠছে। ফলে অন্যরাও একই ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে উৎসাহিত হচ্ছে। সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গতি ও প্রতিযোগিতামূলক চালনা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাস্তব পরিসংখ্যানও সেই সতর্কবার্তাকেই সমর্থন করে। দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ও আহতের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর পেছনে বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের বিষয়গুলো বারবার উঠে এসেছে। তাই এই সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার সমষ্টি হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর সামাজিক ও নিরাপত্তাগত সংকট হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে-সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওগুলো কি আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে? আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, বিদ্যমান আইনের আওতায় জননিরাপত্তা বিপন্নকারী কর্মকাণ্ডের ভিডিও বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, নম্বর প্লেট শনাক্তকরণ এবং ডিজিটাল প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমে অপরাধীদের চিহ্নিত করা সম্ভব। বিশ্বের বহু দেশ ইতোমধ্যে এই ধরনের পদ্ধতি ব্যবহার করছে। তবে কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়। সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পরিবহন মালিক ও চালকদের জবাবদিহির আওতায় আনা, মহাসড়কে কার্যকর স্পিড ক্যামেরা স্থাপন এবং সামাজিকমাধ্যমে বিপজ্জনক কনটেন্টের প্রচার নিরুৎসাহিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে কনটেন্ট নির্মাতা ও দর্শক-উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে জননিরাপত্তাকে বিনোদনের উপরে স্থান দেওয়ার। সড়ক কোনো প্রতিযোগিতার মঞ্চ নয়; এটি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। ভাইরাল হওয়ার ক্ষণস্থায়ী আকাঙ্ক্ষা যদি মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সড়কে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং মৃত্যুর এই প্রতিযোগিতা বন্ধে এখনই কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।