নতুন শুল্কহারে নৌপথে পণ্য পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২৩ জুন, ২০২৬, ০৩:১০ পিএম
নতুন শুল্কহারে নৌপথে পণ্য পরিবহন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে

নতুন শুল্কহারে দেশের নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়বে। কারণ বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বাড়াতে যাচ্ছে দেশের নৌপথে বিভিন্ন সেবার শুল্কহার। আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে ওই নতুন ট্যারিফ। সর্বশেষ বিগত ২০১৯ সালে নৌপথে শুল্কহার বাড়ানো হয়েছিল। আর সমপ্রতি নৌপথ থেকে মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে শুল্কবৃদ্ধির প্রস্তাব আসে। ওই প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ১৯৫৮ (১৯৫৮ সালের ৭৫ নম্বর অধ্যাদেশ)-এর ১৯ (৩) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃক আদায়যোগ্য ভাড়া, টোল, কর, ফি, অন্যান্য চার্জ পুননির্ধারণ করে নতুন ট্যারিফ তফসিল চূড়ান্ত করেছে। এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন গত ১২ মে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, নৌপথে পণ্য পরিবহন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন চার্জে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফলে নৌযান, বন্দর, ঘাট, পণ্য ওঠানামা, বার্থি, মুরিং ও নৌপথ ব্যবহারের চার্জ বাড়বে। তাতে নৌপথে পণ্য পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ফলে নির্মাণসামগ্রী, কৃষি, শিল্প কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য পরিবহন ব্যয়ে তার প্রভাব পড়বে। এমনিতেই সামপ্রতিক সময়ে দু’দফা জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে নৌ-পরিবহনে ভাড়া বেড়েছে। এখন ঘাট-পয়েন্ট পর্যায়ে পণ্য খালাসে শুল্কহার বাড়ানোর ফলে ইজারাগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান পণ্যের ওপর বাড়তি অর্থ যুক্ত করবে। দেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন রুটে আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন ট্যারিফ কার্যকর হলে বিভিন্ন সেবায় গড়ে প্রায় ৩০ শতাংশ শুল্ক বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কহার তুলনামূলক বেশি বেড়ে যাওয়ায় দেশের কৃষি ও ভোগ্যপণ্য খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্র জানায়, বিগত ২০১৯ সালে দেশীয় কার্গো, বাল্কহেড, ফেরি, ফ্ল্যাট ইত্যাদি নৌযানের কনজারভেন্সি চার্জ প্রতি গ্রস টনে বার্ষিক শুল্ক ৪০ টাকা ছিল। কিন্তু নতুন নিয়মে একই ধরনের দেশীয় কার্গো/বাল্কহেড/ফ্ল্যাট/ফেরি শ্রেণীর চার্জ প্রতি গ্রস টনে ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ শুল্ক বৃদ্ধির হার ১৫০ শতাংশ। আর বিদেশী পতাকাবাহী পণ্যবাহী নৌযানের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালে চার্জ ছিল প্রতি গ্রস টনে ২১০ টাকা। কিন্তু নতুন ট্যারিফ কাঠামোয় তা ৮০০ টাকা হবে। সেক্ষেত্রে শুল্ক বেড়েছে প্রায় ২৮১ শতাংশ। নৌযানের পাইলটেজ ফি প্রতি বিট ৫০০ থেকে বাড়িয়ে ৭৫০ টাকা করা হয়েছে। পাইলটেজ ফি বৃদ্ধিতে চট্টগ্রাম থেকে চরগজারিয়া/আজাদ বাজার পর্যন্ত নৌপথকে চার বিট হিসেবে গণনা করায় ওই রুটে ব্যয় আরো বাড়বে। তাতে ট্রিপপ্রতি অনেকটা বেড়ে যাবে পণ্যবাহী বড় নৌযান ও বাল্ক কার্গো পরিবহনের খরচ। নতুন বর্ধিত শুল্কহারে সবচেয়ে বেশি বার্থিং চার্জ বেড়েছে। ২০১৯ সালে পণ্যবাহী নৌযানের জন্য টনভিত্তিক একাধিক স্তর ছিল। ওই সময়ে ৫০ টন পর্যন্ত নৌযানের জন্য ১২৫ টাকা, ৫১-১০০ টনে ১৫০ টাকা, ১০১-২৫০ টনে ১৭৫ টাকা, ২৫১-৫০০ টনে ২০০ টাকা, ৫০১-৭৫০ টনে ২৪০ টাকা, ৭৫১-১,০০০ টনে ৩১৫ টাকা, ১,০০১-১,৫০০ টনে ৪০০ টাকা, ১,৫০১-২,০০০ টনে ৫৭৫ টাকা, ২,০০১-২,৫০০ টনে ৮৫০ টাকা, ২,৫০১-৩,০০০ টনে ১ হাজার ১২৫ টাকা এবং তিন হাজার টনের ঊর্ধ্বে ১ হাজার ৬৮০ টাকা ছিল। আর নতুন শুল্কহারে ৫০০ টন পর্যন্ত ৩০০ টাকা, ৫০১-১,০০০ টনে ৫০০ টাকা, ১,০০১-২,৫০০ টনে ১ হাজার টাকা এবং ২ হাজার ৫০০ টনের ঊর্ধ্বে চার্জ ২ হাজার টাকা করা হয়েছে। ফলে মাঝারি আকারের নৌযানে সবচেয়ে বেশি পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়বে। মাঝারি পণ্যবাহী নৌযানের শুল্কহার ১০৮ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে।

সূত্র আরো জানায়, নতুন শুল্কহারে মুরিং চার্জও বেড়েছে। ২০১৯ সালে পণ্যবাহী নৌযানের মুরিং চার্জ ৫০ টন পর্যন্ত ছিল ৬২ টাকা, ৫১-১০০ টনে ৭৫ টাকা, ১০১-২৫০ টনে ৮৭ টাকা, ২৫১-৫০০ টনে ১০০ টাকা, ৫০১-৭৫০ টনে ১২০ টাকা, ৭৫১-১,০০০ টনে ১৫৭ টাকা, ১,০০১-১,৫০০ টনে ২০০ টাকা, ১,৫০১-২,০০০ টনে ২৮৭ টাকা, ২,০০১-২,৫০০ টনে ৪২৫ টাকা এবং তিন হাজার টনের ঊর্ধ্বে ৭৮৪ টাকা। নতুন শুল্কহারে ২৫০ টন পর্যন্ত মুরিং চার্জ ১০০ টাকা, ২৫১-৫০০ টনে ১৫০ টাকা, ৫০১-১,০০০ টনে ২০০ টাকা, ১,০০১-১,৫০০ টনে ৩৫০ টাকা, ১,৫০১-২,০০০ টনে ৫০০ টাকা, ২,০০১-২,৫০০ টনে ৬৫০ টাকা এবং ২ হাজার ৫০০ টনের ঊর্ধ্বে ১ হাজার টাকা করা হয়েছে। এখানে ১,০০১-১,৫০০ টনের ক্ষেত্রে মুরিং চার্জ বেড়েছে ৭৫ শতাংশ, ১,৫০১-২,০০০ টনে ৭৪ এবং ২,০০১-২,৫০০ টনের মুরিং চার্জ বেড়েছে প্রায় ৫৩ শতাংশ। নতুন শুল্কহারে পণ্য ওঠানামা বা ল্যান্ডিং-শিপিং/থ্রু-পুট চার্জেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০১৯ সালে বন্দর এলাকায় পণ্য ওঠানামায় প্রতি টনের চার্জ ছিল ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা। ২০২৬ সালে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্যের জন্য প্রতি ১০০ কেজিতে ৭ টাকা বা প্রতি টন ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি টনের চার্জ বেড়েছে ১০৩ শতাংশ। লাইসেন্সপ্রাপ্ত জেটি বা ফোরশোর দিয়ে পণ্য ওঠানামার ক্ষেত্রেও প্রতি টনে ৫০ টাকা এবং প্রতি ঘনফুটে ৫০ পয়সা চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে নৌপথ ব্যবহারকারীদের মতে, ২০২৬ সালের ট্যারিফ কাঠামোয় দেশীয় কার্গো নৌযানের কনজারভেন্সি চার্জ আড়াই গুণ, বিদেশী পণ্যবাহী নৌযানের চার্জ প্রায় চার গুণ, পণ্য ওঠানামার চার্জ দ্বিগুণের বেশি এবং মাঝারি আকারের পণ্যবাহী নৌযানের বার্থিং-মুরিং চার্জ ৫০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নতুন শুল্কহারে পণ্যবাহী নৌযানের শ্রেণী বিন্যাসের পরিবর্তন ছাড়াও ছোট স্তরের সংখ্যা কমিয়ে বড় ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাতে কিছু কিছু নৌযানের জন্য আগের তুলনায় উচ্চহারের শ্রেণিতে চার্জ বা শুল্ক পরিশোধ করতে হবে। বিশেষ করে ৫০১ থেকে ২ হাজার ৫০০ টনের নৌযানে বার্থিং ও মুরিং ব্যয় আগের তুলনায় বেশি বেড়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ নৌপথে সিমেন্ট, পাথর, বালি, কয়লা, সার, খাদ্যশস্য ও শিল্প কাঁচামাল পরিবহনে এ ধরনের নৌযানের ব্যবহার বেশি হয়। ফলে নতুন শুল্কহার সরাসরি বাল্ক পণ্য পরিবহনের খরচে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অথচ নৌপথ সাধারণত সড়ক ও রেলের তুলনায় কম ব্যয়বহুল পরিবহনমাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। নৌপথে নতুন শুল্কহার কার্যকর হলে দেশের মাঝারি ও ভারী শিল্পের কাঁচামাল, ভোগ্যপণ্য পরিবহনে ব্যয় বেড়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ দেশের বন্দরগুলোয় পণ্য আমদানির পর ওসব কাঁচামালের একটি বড় অংশ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট-মাঝারি লাইটারেজ জাহাজে পরিবহন হয়। বিশেষ করে বাল্কে আমদানি হওয়া শস্য, সিমেন্ট ক্লিংকার, ইস্পাতপণ্য, ভোজ্যতেল বড় জাহাজ থেকে দেশীয় নৌযানে করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের প্রধান প্রধান শিল্প এলাকায় পরিবহন করা হয়। তাছাড়া দেশের ১৯টি উপকূলীয় ও নৌ-পরিবহন সুবিধা থাকা জেলাগুলোয় ছোট ও মাঝারি নৌযানে পণ্য পরিবহন হয়।

অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএ সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের বিগত ছয়-সাত বছরে সড়ক ও রেলপথে পরিবহন খরচ অনেক বেড়েছে। জ্বালানি, শ্রমিক মজুরিসহ পরিচালন ব্যয় বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে নৌপথে শুল্কহার বাড়ানো হয়নি। সংস্থাটি নৌপথ সংরক্ষণ, ড্রেজিং, ঘাট ব্যবস্থাপনা, টার্মিনাল উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও নৌ-সহায়ক অবকাঠামোর ব্যবস্থাপনা করে। প্রতি বছর ওসব খাতে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে। সাত বছরে মূল্যস্ফীতি, মজুরি, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রীর খরচ বেড়ে যাওয়ায় কর্তৃপক্ষের রাজস্ব কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজনে নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শুল্কহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক একেএম আরিফ উদ্দিন (বন্দর ও পরিবহন) জানান, নৌখাতের চার্জ তিন বছর অন্তর বাড়ানোর নিয়ম রয়েছে। বিভিন্ন কারণে শুল্কহার বাড়ানোর প্রক্রিয়া ছয়-সাত বছর পিছিয়েছে। ওই সময়ে অনেক কিছুর ব্যয় বেড়েছে। বিআইডব্লিউটিএর পরিচালন ব্যয়ও বেড়েছে। সার্বিকভাবে সরকার সব পক্ষের জন্য সহনীয় রেখে নৌযান ও নৌপথের বিভিন্ন চার্জ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন শুল্কহার কার্যকর হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে