পূর্ব সুন্দরবনে বন অপরাধ প্রতিরোধে বনরক্ষীদের নজরদারি ও নিরবচ্ছিন্ন অভিযানের ফলে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে বন বিভাগ। বনে অপরাধের মাত্রা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। গত এক বছরে সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে ফুট পেট্রোলিং পরিচালিত ৪৭৪টি বিভিন্ন সাঁড়াশি অভিযানে ৩৭৭ জন বন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে লক্ষাধিক ফুট হরিণ ধরার ফাঁদ, ২৪৯ কেজি হরিণের মাংস এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ মৎস্য ও কাঁকড়া আহরণের সরঞ্জাম। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী শিকার চিরতরে বন্ধ করতে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ হরিণসহ বন্যপ্রাণী শিকার ও বন অপরাধে জড়িত ১৫০ জনের একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করে আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে হস্তান্তর করেছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের মে মাস থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত সময়ের মধ্যে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় বনরক্ষীরা বনের গহীনে হেঁটে ও জলপথে ৪৭৪টি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেন। এই এক বছরে বন অপরাধের দায়ে মোট ২৪১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৩৯৬ জন আসামির মধ্যে ৩৭৭ জনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, বনের বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে গত এক বছরে জব্দকৃত সামগ্রীর তালিকায় রয়েছে ৪৪৮টি ট্রলার, ১০০টি নৌকা, ৮ হাজার ৩৮১টি অবৈধ কাঁকড়া ধরার ফাঁদ, ৩০০ ফুট মাছ ধরার জাল এবং ১ হাজার ৬৬ কেজি অবৈধভাবে আহরিত কাঁকড়া। এছাড়া সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারি চক্রের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ সময় দস্যু ও অসাধু চক্রের কাছ থেকে ৯৬ বোতল ও ৫ প্যাকেট মাছ মারার বিষ, বিষ দিয়ে ধরা ৭২৪ কেজি মাছ, ২২ বস্তা বিষযুক্ত চিংড়ির শুঁটকি এবং ২১৭ কেজি বিভিন্ন প্রজাতির সাধারণ মাছ জব্দ করা হয়। পূর্ব সুন্দরবনের অভ্যন্তরে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে পেতে রাখা ফাঁদে বিভিন্ন সময়ে ১৭টি হরিণ ও একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় ১ লাখ ১৪ হাজার ৫৫৩ ফুট ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে। বর্তমান ডিএফও মো. রেজাউল করিম চৌধুরী সুন্দরবন পূর্ব বিভাগে যোগদান করার পর থেকে হরিণ ও বন্যপ্রাণী শিকার প্রতিরোধে বন বিভাগকে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন। তারই ধারাবাহিকতায় এই বিপুল পরিমাণ ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। এর আগে কখনো এর চার ভাগের এক ভাগও ফাঁদ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, বনরক্ষীরা চরম ঝুঁকি ও কষ্ট মাথায় নিয়ে দুর্গম বনে হেঁটে নিয়মিত টহল দেওয়ায় বন অপরাধ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, গত এক বছরে বনের বিভিন্ন স্থান থেকে ২৪৯ কেজি হরিণের মাংস উদ্ধার করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি কম। মাংস উদ্ধারের এই বিশাল ব্যবধানই প্রমাণ করে যে সুন্দরবনে হরিণ শিকারের প্রবণতা এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। ডিএফও আরও জানান, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী শিকার পুরোপুরি বন্ধ করতে পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন এলাকাগুলোর ১৫০ জন পেশাদার হরিণসহ বন্যপ্রাণী শিকারির একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এই তালিকা ইতিমধ্যে পুলিশ, র্যাব ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাকে সরবরাহ করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত এই শিকারিরা বর্তমানে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কড়া নজরদারির মধ্যে রয়েছেন, যাতে তাঁরা কোনোভাবেই বনের ভেতর প্রবেশ করতে না পারেন। সুন্দরবন সংলগ্ন স্থানীয় বিশাল জনগোষ্ঠী এ ব্যাপারে সহযোগিতা করলে বন অপরাধ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।