চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হবে

এফএনএস
| আপডেট: ২৫ জুন, ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম | প্রকাশ: ২৫ জুন, ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম
চিকিৎসা ব্যয় কমাতে হবে

স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অধিকার পেতে চিকিৎসক ফি, রোগ নির্ণয় ও ওষুধ কিনতে রোগীকে যদি নিঃস্ব হতে হয়, তাহলে জনকল্যাণের নীতি কি প্রশ্নবিদ্ধ হয় না? এ ছাড়া আছে কমিশনের লোভে একশ্রেণির চিকিৎসকের রোগ নির্ণয়ে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা আর ব্যবস্থাপত্রে অতিরিক্ত ওষুধ লেখার প্রবণতা। প্রতিবছর চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে ৬১ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। এই বাস্তবতা দেখায় যে স্বাস্থ্য খাত আর শুধু একটি সেবা খাত নয়, এটি দারিদ্র্য বৃদ্ধিরও বড় একটি উৎসে পরিণত হয়েছে। সামপ্রতিক পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা কেবল চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতায় থেমে নেই; এটি সরাসরি দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সামাজিক অনিশ্চয়তাকে গভীর করছে। স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় যখন সরাসরি মানুষের পকেট থেকে আসে, তখন সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বাস্তবে অর্থহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ব্যক্তিগত ব্যয়ের হার দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনকভাবে বেশি। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সেবা প্রতিষ্ঠানের সীমিত প্রস্তুতি, মানবসম্পদের ঘাটতি ও সেবার মান নিয়ে অনিশ্চয়তা। দেশের প্রায় অর্ধেক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় সেবা দিতে প্রস্তুত নয় এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাগত অবহেলার ফল। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী সারা বিশ্বে গত ২০ বছরে স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে অসুস্থ ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সুরক্ষার ক্রমশ নেতিবাচকতার দিকে গেছে। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারিভাবে আইসিইউ আছে ১ হাজার ১৯৫টি, এর মধ্যে ৭৫ শতাংশই রাজধানীকেন্দ্রিক। ৩৪টি জেলা শহরে নেই আইসিইউর ব্যবস্থা। রোগীদের প্রতি চিকিৎসকদের অবহেলা, রোগ নির্ণয়ে উন্নত চিকিৎসা সরঞ্জমাদি না থাকা, দক্ষ টেকনিশিয়ানের ঘাটতি, ওষুধের স্বল্পতা, মানহীন ভেজাল ওষুধের সয়লাব। এ ছাড়া বেসরকারি হাসপাতালের মোট ব্যয়ের প্রায় ৮৯ ভাগ ব্যক্তির পকেট থেকে খরচ হয়। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, জীবন রক্ষাকারী মাত্র ১১টি ওষুধের দাম সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বাকি সব প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নিজের মতো করে খেয়াল খুশিমতো নানা অজুহাতে প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম অযৌক্তিভাবে বাড়িয়ে থাকে। বহুল সমস্যায় জর্জরিত স্বাস্থ্য খাত। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, ওষুধ বাণিজ্য, কৃত্রিম সংকট, মানহীন ওষুধের আদিখ্যেতা, জেন্ডারভিত্তিক বৈষম্য, দুর্বল অবকাঠামো, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত তাৎক্ষণিক সেবা প্রদানে অক্ষমতা, চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বৈষম্যমূলক অমানবিক আচরণ, উদাসীনতা, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাবে প্রমোশন-বদলি। এ ছাড়া চিকিৎসক, নার্স, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের অভাব, চিকিৎসার্থীদের জন্য দক্ষ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। চিকিৎসসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মক্ষেত্রে যথাসময়ে আগমন ও প্রস্থানে নিয়মনীতি না মানা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকট, মান্ধাতা আমলের স্বাস্থ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি, অ্যাম্বুলেন্স সংকট। চিকিৎসাসেবার মতো মৌলিক অধিকার নিশ্চিতের ক্ষেত্রে অথবা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সূচকে যে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ, এটি স্বীকার করতেই হবে। সুতরাং, এটি নিশ্চিত করতে সরকারের যথাযথ পরিকল্পনা ও আন্তরিকতা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দের অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি হাসপাতালে সেবা নিতে আসা রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ বিনামূল্যে প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে