জাতীয় বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং উন্নয়ন কৌশলের প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির পর্যবেক্ষণ তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। বিশেষ করে কর কাঠামো, কর্মসংস্থান, রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্নগুলো অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সিপিডির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো ব্যক্তি আয়করের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম আয়ের মানুষের ওপর করের চাপ বেশি বৃদ্ধি পাওয়া। একটি ন্যায়সঙ্গত করব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ‘প্রগতিশীল করনীতি’, যেখানে অধিক আয়ের ব্যক্তিরা তুলনামূলক বেশি হারে কর বহন করবেন। যদি মধ্যম আয়ের মানুষের করের বোঝা দ্রুত বৃদ্ধি পায় অথচ উচ্চ আয়ের ক্ষেত্রে তার প্রভাব তুলনামূলক কম হয়, তাহলে তা সামাজিক ন্যায়বিচার ও আয় বৈষম্য হ্রাসের লক্ষ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। ফলে কর সংস্কারের ক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণের পাশাপাশি সামাজিক ভারসাম্যের বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। একইভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য এবং বাজেট বরাদ্দের মধ্যে সামঞ্জস্যের প্রশ্নও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য ঘোষিত হলেও সংশ্লিষ্ট খাতগুলোর বরাদ্দে উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ না থাকলে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে। কর্মসংস্থান কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ফল নয়; এটি নীতিগত পরিকল্পনা, বিনিয়োগ পরিবেশ এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গেও নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন জরুরি। অতীতের সংগ্রহ প্রবণতা এবং বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থার তুলনায় অত্যন্ত উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলে তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চাপ তৈরি করতে পারে। একইভাবে উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় বরাদ্দ ইতিবাচক হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া কেবল বরাদ্দ বাড়ানো কাঙ্ক্ষিত ফল নিশ্চিত করতে পারে না। তবে বাজেটের ইতিবাচক দিকও রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু বরাদ্দের পরিমাণের চেয়ে তার কার্যকর ব্যবহারই শেষ পর্যন্ত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য প্রয়োজন, তবে সেই লক্ষ্য অবশ্যই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং কার্যকর বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। বাজেটের সাফল্য শেষ পর্যন্ত কাগজে ঘোষিত লক্ষ্যে নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনমান, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় এর বাস্তব প্রভাবের মধ্যেই পরিমাপ হবে।