সিলেটের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবুজ চা-বাগান, পাহাড়-টিলা আর স্বচ্ছ জলধারা। সেই সৌন্দর্যের ভাণ্ডারে এবার নতুন মাত্রা যোগ করতে যাচ্ছে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসংলগ্ন বাইশটিলা ন্যাচারাল পার্ক। দীর্ঘদিন ধরে অনেকটাই অবহেলায় পড়ে থাকা এই সবুজ টিলাকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে একটি বৃহৎ মহাপরিকল্পনা। পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি শুধু একটি পার্ক নয়, বরং প্রকৃতি, বিনোদন ও পর্যটনের সমন্বয়ে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় অবকাশকেন্দ্রে পরিণত হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এরইমধ্যে বাইশটিলা ন্যাচারাল পার্ক এলাকা পরিদর্শন করেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি জেলা পরিষদের চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম ঘুরে দেখেন এবং প্রকল্পের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত হন। পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, সরকারের সহযোগিতায় এই প্রকল্পকে এমনভাবে গড়ে তোলা হবে, যাতে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জন্য এটি একটি অনন্য গন্তব্য হয়ে ওঠে।
প্রকৃতির কোলে দিনব্যাপী অবকাশ
জেলা পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের প্রথম ধাপে একটি ছোট্ট প্রাকৃতিক টিলা এবং তার তিন দিকজুড়ে বিস্তৃত জলাশয়কে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হচ্ছে ‘দিনব্যাপী প্রাকৃতিক অবকাশ যাপন কেন্দ্র’। পুরো পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে দর্শনার্থীদের জন্য আধুনিক ও আরামদায়ক ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, সরকারি সড়কের পাশে থাকবে একটি দর্শনার্থী রিসেপশন পয়েন্ট ও ঘাট। সেখানে টিকিট সংগ্রহ ও নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষে স্পিডবোট কিংবা দেশীয় নৌকায় করে জলাশয় পেরিয়ে পৌঁছাতে হবে বিপরীত তীরের ল্যান্ডিং ডেকে। সেখান থেকে টিলার গা বেয়ে নির্মিত সিঁড়ি ধরে উপরে উঠলেই মিলবে প্রকৃতির নির্মল আবহ।
টিলার বিভিন্ন উচ্চতায় নির্মিত হবে দৃষ্টিনন্দন দু’চালা ও চৌচালা ছাউনি। এসব বিশ্রামস্থলে বসে একদিকে যেমন উপভোগ করা যাবে চারপাশের সবুজ বনানী, অন্যদিকে চোখে ধরা দেবে শান্ত জলাশয়ের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে থাকবে কিচেন, হালকা খাবারের ব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্ন রেস্টরুম।
প্রকৃতি থাকবে প্রকৃতির মতোই
প্রকল্প বাস্তবায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে-এখানে প্রকৃতিকে বদলে দেওয়া নয়, বরং সংরক্ষণ করেই উন্নয়ন করা হবে। বিদ্যমান গাছপালা কাটা হবে না। আকাশমণি গাছের পাশাপাশি স্থানীয় ও দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ ও গুল্ম রোপণের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য আরও সমৃদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের নকশাকার স্থপতি রাজন দাশ। তিনি জানান, বাইশটিলাকে এমন একটি প্রাকৃতিক অবকাশকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখানে মানুষ প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি থেকে সময় কাটাতে পারবেন। জলাশয় পেরিয়ে টিলায় ওঠার পুরো যাত্রাটিই দর্শনার্থীদের জন্য হবে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
থাকবে রোপ ব্রিজ, মাছ ধরা ও বিনোদনের নতুন আয়োজন
প্রথম ধাপের প্রকল্পেই দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে বেশ কিছু ব্যতিক্রমী আয়োজন। ঝিলের মাঝখানের একটি মাটির ঢিবিকে ঘিরে নির্মিত হবে দড়ির ঝুলন্ত সেতু বা রোপ ব্রিজ। পাশাপাশি শখের মাছ শিকারিদের জন্য বরশি দিয়ে মাছ ধরার সুযোগও রাখা হবে।
প্রকৃতির নিরিবিলি পরিবেশে পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনকে নিয়ে একটি দিন কাটানোর জন্য বাইশটিলা হয়ে উঠতে পারে এক নতুন ঠিকানা। এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দ্বিতীয় ধাপে যুক্ত হবে কেবল কার ও রিসোর্ট
জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপের জন্য ইতোমধ্যে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ধাপে বাইশটিলাকে কেন্দ্র করে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে কেবল কার লাইন, শিশুদের জন্য আধুনিক রাইড ও খেলাধুলার ব্যবস্থা, ফুডকোর্ট, অ্যাম্ফিথিয়েটার, মেলার মাঠ, রিসোর্ট, পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা এবং আধুনিক রেস্টরুম।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়িত হলে বাইশটিলা কেবল সিলেট নয়, দেশের পর্যটন মানচিত্রে একটি নতুন আকর্ষণ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।