কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলাটি একটি পৌরসভাসহ ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় সরবরাহ করা টঐঞ দুধে পোকা, নষ্ট ও নিম্নমানের দুধ পাওয়ার অভিযোগে উদ্বেগ ছড়িয়েছে অভিভাবক ও সচেতন মহলে। তবে এ ঘটনায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে দুধের প্যাকেটে পোকা পাওয়ার কথা শিক্ষা অফিস থেকে জেলা শিক্ষা অফিস বরাবরে রিপোর্ট পাঠানো হয়েছে। এই নিয়ে অভিভাবকদের মাঝে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, গত ১১ জুন থেকে ২২ জুন পর্যন্ত বাজিতপুর উপজেলার ১১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাণ গ্রুপের নরসিংদী ডিপোর মাধ্যমে টঐঞ দুধ সরবরাহ করা হয়। সরবরাহের পর হুমাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ একাধিক বিদ্যালয় থেকে দুধের মান নিয়ে অভিযোগ আসে। গত সোমবার (২৯ জুন) ৪ নং হুমাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপবৃত্তি-সংক্রান্ত কাজে গিয়ে এক অভিভাবক বিদ্যালয়ে সংরক্ষিত দুধের প্যাকেট দেখতে পান। তার দাবি, কয়েকটি প্যাকেটে ধুলাবালি ও ময়লা জমে ছিল। এছাড়া কিছু প্যাকেটের গায়ে ১০ থেকে ১৫টি পর্যন্ত পোকা চলাফেরা করতে দেখেন তিনি। পরে বিষয়টি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে জানান।
ওই অভিভাবক বলেন, "আমি আগে কখনও স্কুলে এসে দুধ দেখিনি। আজ যে অবস্থা দেখলাম, তাতে মনে প্রশ্ন জাগছে-আমাদের শিশুদের কি দীর্ঘদিন ধরেই এমন দুধ খাওয়ানো হচ্ছে? যে খাবার একজন সুস্থ মানুষ দেখলেও খেতে চাইবে না, সেটি কীভাবে শিশুদের দেওয়া হবে?" একই ধরনের অভিযোগ উপজেলার মাছিমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেও পাওয়া গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে। এদিকে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোকে পোকাযুক্ত নষ্ট ও নিম্নমানের দুধ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ না করে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা প্রমাণ হিসেবে ছবি, ভিডিও ও নষ্ট দুধ সংরক্ষণ করতে বলেন। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া হুমাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুধের প্যাকেটগুলো বিতরণের জন্য রাখা হয়নি; বরং অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল। পরে ক্ষতিপূরণ হিসেবে কয়েকটি বিদ্যালয়ে নতুন দুধ সরবরাহ করা হয়েছে।
তবে পুরো প্রতিবেদনে কোথাও দুধের প্যাকেটে পোকা পাওয়ার অভিযোগের কথা উল্লেখ আছে। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং কয়েকজন অভিভাবকের বক্তব্যে পোকা দেখা যাওয়ার দাবি উঠে এসেছে। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে, পোকা পাওয়ার অভিযোগটি তদন্ত করা হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে তার ফলাফল প্রতিবেদনে কেন প্রতিফলিত হয়নি এবং বিষয়টি পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না। এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আব্দুর রশিদ বলেন, "এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।" তবে দুধের প্যাকেটে পোকা পাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি।
স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকদের মতে, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা। তাই শুধু নষ্ট দুধ পরিবর্তন করাই যথেষ্ট নয়; দুধের প্যাকেটে পোকা পাওয়ার অভিযোগসহ সব অভিযোগের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বৈজ্ঞানিক তদন্ত হওয়া জরুরি। তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা। এ ঘটনায় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-দুধের প্যাকেটে পোকা পাওয়ার অভিযোগটি যদি সত্য না হয়, তবে তা স্পষ্টভাবে জানানো হোক; আর যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে সরকারি প্রতিবেদনে সেটি উল্লেখিত আছে। শিশুদের খাদ্য নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তরই এখন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার। প্রাণ কোম্পানির নরসিংদী ডিপোর ম্যানেজার মোঃ তৌহিদুল ইসলাম বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মীদের মুঠোফোনে বলেন, বৃষ্টির কারণে এবং অতিরিক্ত হ্যান্ডেলিং এর কারণে প্যাকেটগুলো লিকেজ হওয়ায় দুধ নষ্ট ও পোকা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।