রাজশাহীর তানোরে কৃষিপণ্যর দরপতনে কৃষকেরা বিপাকে ও চরম সংকটের মধ্যে দিনপাত করছেন। অথচ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত পরিশ্রম করে কৃষিপণ্য উৎপাদন করছেন। কিন্তু সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা না থাকায় এসব উৎপাদিত কৃষিপণ্যর ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না কৃষক। এতে প্রতিনিয়ত তারা একের পর এক লোকসানের মুখে পড়ছেন তারা।
জানা গেছে, আলুর পর এবার রোবো ধানে চরম লোকসানে পড়েছে কৃষক। অপরদিকে, আমেরও এবার দরপতন হয়েছে। এতে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে দাম কম থাকায় কৃষকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক কৃষক ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছেন, কেউ কেউ শেষ সম্বলটুকুও হারিয়েছে, আবার কেউ এনজিও ঋণের টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে এলাকাছাড়া হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন।
তানোরে আলুর জমিতে রোপণ করা বোরো ধান কাটা-মাড়াই শেষের পথে। মাঠ থেকে নতুন ধান উঠছে। অপরদিকে গাছে গাছে ঝুলছে পাকা আম। কিন্তু কৃষকের মুখে নেই হাসি। কারণ বাজারে ধান ও আমের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। উৎপাদন খরচ তুলতে না পারার শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। বাজারে প্রতি মণ (২৮ কেজি) ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। কৃষকদের দাবি, বর্তমান উৎপাদন খরচের সঙ্গে এ দাম কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩ মে থেকে ধান ও ১৫ মে থেকে চাল সংগ্রহ শুরু হয়েছে। যা ৩১ আগস্ট/২০২৬ পর্যন্ত সংগ্রহ অভিযান চলবে। সরকার নির্ধারিত মূল্যে প্রতি কেজি বোরো ধান ৩৬ টাকা, সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা এবং আতপ চাল ৪৮ টাকা দরে কেনার নিয়ম বেধে দেয়া হয়েছে। এই মৌসুমে তানোরে ১ হাজার ৮ মেট্রিকটন খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে তানোর খাদ্যগুদামের এলএসডি আফরোজা নিশ্চিত করেছেন।
উপজেলার কলমা ইউনিয়নের বিল্লী গ্রামের কৃষক সারোয়ার জাহান চলতি মৌসুমে ২০ বিঘা জমিতে ব্রি-৭৬ জাতের বোরো ধান চাষ করেছেন। মঙ্গলবার তিনি ধান কেটে মাড়াই শেষে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রির চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ২০ বিঘা জমির ধান মেশিন দিয়ে কেটে কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রির জন্য গিয়েছিলাম। কেউ কিনতে চায়নি। পরে একজন ব্যবসায়ী ৮০০ টাকা মণ দরে ধান কিনতে রাজি হয়। এ দামে ধান বিক্রি করলে উৎপাদন খরচই উঠবে না। তার কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা লোকসান হবে। তার মতো একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন তানোর উপজেলার হাজারো কৃষক। কৃষকেরা বলছে, সেচ, সার, বীজ, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় ধান উৎপাদনের ব্যয়ও বেড়েছে। অথচ বাজারে ন্যায্যমূল্য না থাকায় কৃষকরা চরম আর্থিক সংকটে পড়ছেন।
কৃষকদের অভিযোগ, গত বছরও আলুর ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় বহু কৃষক ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছিলেন। অনেকেই ব্যাংক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে আর্থিক সংকটে পড়েছেন। আলুতে চলতি বছরেও একই পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অপরদিকে, সরকার নির্ধারিত দামে বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে না। সরকারি খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে গেলে ধানের আদ্রতা নেই, আর বরাদ্দ শেষ হয়ে গেছে বলে তাড়িয়ে দিচ্ছেন এলএসডি আফরোজা। কিন্তু ব্যবসায়ী ও চালকল মালিকের কাছে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে তাদের মাধ্যমে ধান ও চাল সংগ্রহ চলছে দেদারসে।
একের পর এক ফসলে লোকসান হওয়ার পরও ব্যাংক থেকে ক্লোজিং চাপে পড়েছেন কৃষক। এ সুযোগে অনেক চালকল মালিক ধান ক্রয়ে ধীরগতি অবলম্বন করছেন। ফলে বাজারে ধানের চাহিদা কমে গেছে এবং দামও নিম্নমুখী। তাদের দাবি, জুলাই মাস থেকে ধানের বাজারে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
এব্যাপারে তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মেদ বলেন, তাদের কাজ হচ্ছে চাষাবাদে রোগ বালাই আছে কি না। আর ক্ষেতে রোগ বালাই হলে দূর করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। দামের বিষয় কৃষি বিপণন বিভাগের কাজ নয়। তবে, চলতি মৌসুমে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ হাজার ২০০ হেক্টর। কিন্তু চাষাবাদ হয়েছে ১৪ হাজার ১৩০ হেক্টর। ফলন আশানুরুপ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।