দেশের কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণে চলতি অর্থবছরে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেছে। লক্ষ্যমাত্রার প্রায় শতভাগ ঋণ বিতরণ কৃষি উৎপাদন, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং খাদ্যনিরাপত্তার জন্য আশাব্যঞ্জক। তবে একই সময়ে কৃষিখাতে খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি এই সাফল্যের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা নীতিনির্ধারক ও ব্যাংকিং খাতের জন্য সমানভাবে উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে কৃষিখাতে খেলাপি ঋণ প্রায় তিন গুণ বেড়ে ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি, যা মোট খেলাপি ঋণের বড় অংশ ধারণ করছে। তবে এই বৃদ্ধির পেছনে কেবল ঋণগ্রহীতাদের পরিশোধে ব্যর্থতাকে দায়ী করলে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন ঋণ শ্রেণীকরণ ও প্রভিশনিং নীতিমালা কার্যকর হওয়ায় আগে পুনঃতফসিল বা বিলম্বিত হিসেবে থাকা অনেক ঋণ এখন আনুষ্ঠানিকভাবে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণের এই উল্লম্ফনের একটি অংশ হিসাব-প্রক্রিয়ার পরিবর্তনের ফল। তবু এটাও সত্য, নতুন নীতিমালা ব্যাংকগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং আদায় কার্যক্রমের প্রকৃত অবস্থাকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। ফলে কৃষিঋণের গুণগত মান নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে কৃষি ও পল্লিঋণ বিতরণে প্রায় ১৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রমাণ করে, ব্যাংকগুলো কৃষিখাতে অর্থায়ন অব্যাহত রেখেছে। কৃষি দেশের জিডিপি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই কৃষকের কাছে সময়মতো ঋণ পৌঁছানো যেমন জরুরি, তেমনি সেই ঋণ যথাযথভাবে ব্যবহার এবং নির্ধারিত সময়ে পরিশোধ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজন কেবল খেলাপি ঋণের পরিসংখ্যান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ নয়, বরং সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা, সক্ষম ঋণগ্রহীতাদের নিয়মিত পরিশোধে উৎসাহ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ঋণ তদারকি জোরদার এবং ঝুঁকিভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা জরুরি। একই সঙ্গে নতুন শ্রেণীকরণ নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি অর্থনীতির প্রাণশক্তি। তাই ঋণ বিতরণের সাফল্যের পাশাপাশি ঋণের গুণগত মান ও আদায় সক্ষমতা সমান গুরুত্ব পেলে কৃষিখাতের টেকসই অর্থায়ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও শক্তিশালী হবে।