পটুয়াখালীতে ঝুঁকিতে ৮৫৭ শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশ

এফএনএস (কাজল বরণ দাস; পটুয়াখালী) :
| আপডেট: ৮ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম | প্রকাশ: ৮ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম
পটুয়াখালীতে ঝুঁকিতে ৮৫৭ শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশ

একটি বিদ্যালয় শুধু পাঠদানের স্থান নয়, এটি শিশুদের নিরাপদ বেড়ে ওঠা, শারীরিক-মানসিক বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ গঠনের ভিত্তি। কিন্তু পটুয়াখালীর ঐতিহ্যবাহী শেরেবাংলা বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সেই পরিবেশ বহু বছর ধরে ব্যাহত হচ্ছে জলাবদ্ধতা ও জরাজীর্ণ ভবনের কারণে। ফলে শুধু ভবনের ঝুঁকিই নয়, নিয়মিত পাঠদান, খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার সময় কমে যাচ্ছে এবং তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৮৫৭ জন শিক্ষার্থী এবং ৩০ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। পাঁচটি ভবন থাকলেও অধিকাংশই বহু বছর আগে নির্মিত। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণ করা হয়। এরপর প্রায় ২৯ বছরেও নতুন কোনো ভবন নির্মাণ হয়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনের দেয়ালে বড় বড় ফাটল, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়া এবং ক্ষতিগ্রস্থ বারান্দা এখন নিত্যদিনের চিত্র। সামান্য বৃষ্টিতেই বিদ্যালয়ের মাঠ, চলাচলের পথ ও শ্রেণিকক্ষের সামনের অংশ পানিতে তলিয়ে যায়। কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় কয়েকদিন ধরে পানি জমে থাকে। বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীদের পানি মাড়িয়ে শ্রেণিকক্ষে যেতে হয়। অনেক সময় সাপ, বিচ্ছু ও অন্যান্য বিষধর প্রাণীর আতঙ্কও তৈরি হয়।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর অন্তত: তিন থেকে চার দিন বিদ্যালয় সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়। এছাড়া বর্ষা মৌসুম জুড়ে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ায় অন্যান্য বিদ্যালয়ের তুলনায় বছরে প্রায় ১০ শতাংশ কম ক্লাস অনুষ্ঠিত হয়। এতে নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যসূচি শেষ করতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত চাপ নিতে হয়।

জলাবদ্ধতার প্রভাব শুধু শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ নয়। বিদ্যালয়ের বৃহৎ খেলার মাঠটি বছরের প্রায় ছয় মাস পানির নিচে থাকায় নিয়মিত খেলাধুলা, শারীরিক শিক্ষা (পিটি), কুচকাওয়াজ, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ থাকে। ফলে শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা, নেতৃত্বগুণ, দলগত কাজের দক্ষতা এবং মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাহিমা মিনি বলেন, নতুন ভবন নির্মাণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। তৎকালীন জেলা প্রশাসকের সুপারিশও ছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। জলাবদ্ধতার কারণে প্রতিবছর কয়েকদিন বিদ্যালয় বন্ধ রাখতে হয় এবং নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়।

বিভিন্ন শ্রেনীর শিক্ষার্থী মিম, তাজনিন, সাম্মী, বিথি জানায়, বৃষ্টি হলেই মাঠে হাঁটু সমান পানি জমে যায়। অনেক সময় ভিজে শ্রেণি কক্ষে যেতে হয়। পানি বেশি হলে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় মাঠ পানির নিচে থাকায় খেলাধুলা ও পিটি কার্যক্রমও বন্ধ থাকে।

বিদ্যালয় অভিভাবক আবুল কাশেম, মনোজ কান্তি, মঞ্জু মিয়া বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে সন্তানদের পাঠাতে তারা সবসময় উদ্বেগে থাকেন। একই সঙ্গে নিয়মিত ক্লাস ব্যাহত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়ছে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ এবং স্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবি জানান তারা।

পটুয়াখালী শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. মনিরুল কবির বলেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন পৌরসভার সঙ্গে সমন্বয় করে বাস্তবায়ন করতে হবে। নতুন ভবন নির্মাণ সরকারি অনুমোদন ও বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল। স্থানীয় সংসদ সদস্যের পাঠানো অগ্রাধিকার তালিকায় বিদ্যালয়টির নাম রয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী বলেন, বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়ে তিনি ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দিয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

শিক্ষাবিদদের মতে, এই সংকট শুধু একটি বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত সমস্যা নয়; এটি শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িত। বছরের পর বছর পাঠঘণ্টা কমে যাওয়া, খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান চলতে থাকলে একটি পুরো প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তাই দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংস্কার এবং স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিশ্চিত করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহল।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে