রাজশাহীর তানোর উপজেলার কামারগাঁ সরকারি খাদ্যগুদামে রাজনৈতিক পরিচয়ের জনৈক জুয়েল নামের এক প্রভাবশালী গুদাম কর্মকর্তার যোগসাজশে সিন্ডিকেট করে ধান দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারের দেওয়া ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া ও গুদামে ধান দেয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন প্রকৃত কৃষকরা।
এবারের অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহ অভিযানে অংশগ্রহণ নেই কৃষকের, তাদের নামে ধান দিচ্ছেন রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবশালী জুয়েল নামের এক নেতা। খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার নেপথ্যে মদদে কৃষকের কার্ড ভাড়া নিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃষকের অগোচরে ধান দেয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, সাধারণ কৃষক ধান দিতে গেলে আর্দ্রতাসহ নানা অজুহাতে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এতে বাধ্য হয়ে কৃষক তার কৃষি কার্ড ভাড়া দিচ্ছে। কৃষক রুবেল, শহিদুল, গনেশ ও ফারুক জানান, তারা একাধিকবার গুদামে ধান দিতে গিয়েছেন। তবে ধানের ময়েশ্চার ঠিক নাই বলে ফেরত পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ওই একই ধান কিনে নিয়ে জুয়েল গুদামে দিব্বি দিচ্ছেন। অথচ নীতিমালা অনুযায়ী কার্ডধারী কৃষকের উপস্থিতিতে ধান কেনার কথা। কিন্তু সিন্ডিকেট চক্র শতশত কৃষকের কার্ড দিয়ে ধান দিচ্ছে। আবার যারা ধান দিবে না, তাদের নাম তালিকায় রয়েছে। অধিকাংশক্ষেত্রে শর্ত পুরুণ না করেই এসব ধান নেয়া হচ্ছে।
নিজ এলাকার পরিবর্তে বাইরের এলাকার ধান ঢোকানো হচ্ছে। এছাড়াও টন প্রতি দেড় থেকে ৩ হাজার টাকা আর্থিক সুবিধা নিচ্ছেন এলএসডি। সরেজমিন সিসি ক্যামেরা ও কৃষকের মুঠোফোন নম্বর যাচাই ও গুদামে কেনা ধানের আর্দ্রতা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হলেই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যাবে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাজারে মোটা ধানের দাম সাড়ে ৭০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকা। সেই হিসেবে সাড়ে ২৮ টাকা কেজি ধরে দাম পড়ে। আর সরকার ৩৬ টাকা প্রতি কেজি ধান ক্রয় করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। প্রতি মণে কৃষক হারাচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, পাবনা, নাটোর ও নওগাঁর বিভিন্ন এলাকা থেকে মোটা ধান এনে গুদামে দেয়া হচ্ছে। তবে, খাদ্যগুদাম কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজস করে এ কাজ চলছে। এতে সাধারণ কৃষকদের মাঝে সরকারের ভাবমূতি নষ্ট হচ্ছে।
জানা গেছে, তানোরে চলতি বছরের ১৯ মে মঙ্গলবার ধান কেনা উদ্বোধন করে। ২০২৬ সালের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ৪৯ টাকা কেজি দরে অটো ও হাস্কিং মিল থেকে ৪০৬ মেট্রিক টন সিদ্ধ চাল ও ৩০০ মেট্রিক টন গম এবং ৩৬ টাকা কেজি দরে এক হাজার ৫৬০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহ করা হবে।
আগামী ৩১ আগস্ট এই কার্যক্রম চলবে। এরমধ্যে উপজেলার কামারগাঁ সরকারি খাদ্যগুদামে কামারগাঁ ও কলমা ইউনিয়ন থেকে ৫৫৫ মেট্রিকটন ধান কেনা হবে। প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তার লক্ষ্যে চলতি বোরো মৌসুমে সরকার কেজির ওজনে এক হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরে ধান কিনলেও বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে সাড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। আর সেই ধান কিনে সরকারি গুদামে দিয়ে মণে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত মুনাফার সুযোগ নিচ্ছেন রাজনৈতিক পরিচয়ের এসব প্রভাবশালীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্ষমতাসীন দলের এক জৈষ্ঠ নেতা বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্যি উপজেলার কামারগাঁয় রাজনৈতিক পরিচয়ের কিছু প্রভাবশালী নেতারা এসব করছেন। তারা নিজেদের পছন্দের ইউনিয়ন ভাগ করে নিয়ে নিজেদের বিশ্বস্ত লোক দিয়ে সেসব ইউনিয়নের কৃষকদের ভোটার আইডি সংগ্রহ করে তালিকা প্রস্তুত করিয়েছেন। কৃষকদের সঙ্গে যে প্রতারণা করেছেন তা খুবই দুঃখজনক।
তিনি বলেন, শুরুতে তিনি সাধারণ কৃষক, বিগত সময়ে যেসব কৃষক বঞ্চিত হয়েছেন তাদের তালিকা করে ধান দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু একশ্রেণির প্রভাবশালীর নেতার লোভের কারণে তা সম্ভব হয়নি। এবিষয়ে তিনি দলের হাইকমান্ডের নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী কৃষকদের উন্নয়নে ধানের সন্তোষজনক মূল্য দিয়েছেন। আর তা লুটে নিচ্ছেন একশ্রেণির প্রভাবশালী। এরফলে সরকারের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিৎ।
এবিষয়ে উপজেলার কামারগাঁ খাদ্যগুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসিএলএসডি) আতিকুর রহমান আতিক এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ২০২৬ সালের অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ৪৯ টাকা কেজি দরে চাল ও ৩৬ টাকা দরে ধান-গম ক্রয় অভিযান চলছে। আগামী ৩১ আগস্ট এই কার্যক্রম চলবে। তিনি বলেন, প্রকৃত কৃষকের কাছে থেকেই ধান কেনা হচ্ছে।
এব্যাপারে তানোর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা (টিসিএফ) পারভীন খাতুন বলেন, তিনি কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি। তবে, এবিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নিয়ে দেখা হবে। এদিকে কামাগাঁ ইউপির হরিপুর, ছাঐড়, মালশিরা, কচুয়া ও কাদিরপুর এলাকার প্রায় অর্ধশতাধিক কৃষকের সঙ্গে সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযানের বিষয়ে কথা হলে তাদের প্রায় সবারই বক্তব্য ছিল কাছাকাছি, সরকার ধান কেনে বলে শুনেছি। কিন্তু কীভাবে কখন ধান নেয়, সেই বিষয়ে ধারণা নেই তাদের। এ বিষয়ে কোনো প্রচার চোখে পড়েনি তাদের। বেশিরভাগ কৃষক জানেন না, সরকার কত টাকা মূল্যে ধান কিনছে। সরকারি গুদামে কতটুকু পর্যন্ত ধান দেওয়ার অধিকার রয়েছে একজন কৃষকের বলে আক্ষেপ সবাই।