পেটের ক্ষুধা নিবারণে এক মুঠো ভাত জোগাড় করতে কতটা কঠিন সংগ্রাম করতে হয়, তা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের নদীবিধৌত ও উপকূলীয় এলাকায় না গেলে উপলব্ধি করা কঠিন। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম এলেই এসব অঞ্চলের মানুষের জীবন যেন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। নদীর ফুলে-ফেঁপে ওঠা পানি, বন্যা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা এবং অনিশ্চিত জীবিকা সব মিলিয়ে প্রতিটি দিনই তাদের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ।
বর্ষাকালে অনেক গ্রামের বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে আশ্রয় নেয় আশ্রয়কেন্দ্রে বা উঁচু বাঁধের ওপর। কারও বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়, আবার কেউ হারান ফসলি জমি। জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এসব এলাকায় লঞ্চ ও ছোট বড় নৌকা মানুষের প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। স্কুলে যেতে, বাজার করতে, চিকিৎসা নিতে কিংবা কর্মস্থলে পৌঁছাতে নৌকার ওপরই নির্ভর করতে হয়। প্রতিদিনের এই যাতায়াতে যেমন সময় ও অর্থ ব্যয় হয়, তেমনি থাকে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও। দিনমজুর, জেলে, কৃষক ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন। টানা বৃষ্টি ও বন্যার কারণে কাজ বন্ধ থাকায় তাদের আয়-রোজগার কমে যায়। অনেক পরিবার দিনে একবেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খায়। শিশুদের লেখাপড়া ব্যাহত হয়, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট দেখা দেয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দুর্যোগের সময় সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা মিললেও তা অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। নদীভাঙন রোধ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হলে এই অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কমবে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই শুধু ত্রাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে এসব মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এক মুঠো ভাতের জন্য প্রতিদিনের এই কঠিন সংগ্রাম উন্নয়নের নানা পরিসংখ্যানের আড়ালে চাপা পড়ে গেলেও দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো পরিবারের কাছে এটাই বাস্তবতা। তাদের জীবন সংগ্রাম মনে করিয়ে দেয়,প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব, যখন দেশের সবচেয়ে দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জীবনও হবে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ এবং স্বস্তির।