ফল উৎপাদনে অগ্রগতি হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণ-রপ্তানিতে স্থবিরতা

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০৮:১৬ এএম
ফল উৎপাদনে অগ্রগতি হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণ-রপ্তানিতে স্থবিরতা

ঢাকা মৌসুমি ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বসেরা কাতারে অবস্থান করলেও উৎপাদিত ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ বা ‘ফ্রুট-প্রসেসিং’ শিল্পে কাঙ্ক্ষিত গতি মিলছে না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যানুযায়ী, ফল উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে ৯ম স্থানে এবং আম, কাঁঠাল ও পেয়ারার মতো নির্দিষ্ট কিছু ফল উৎপাদনে শীর্ষ দেশগুলোর প্রথম সারিতে রয়েছে। তবে এই বিপুল অর্জনের বিপরীতে উদ্বেগের বিষয় হলো, দেশে মোট উৎপাদিত ফলের মাত্র দুই শতাংশেরও কম প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। যেখানে বিশ্বের অন্যান্য শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলো তাদের ফলের অর্ধেকের বেশি প্রক্রিয়াজাত করে মূল্যবান খাদ্যপণ্য তৈরি করছে, সেখানে বাংলাদেশে উপযুক্ত পরিকাঠামো ও আধুনিক সংরক্ষণের অভাবে প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ ফল নষ্ট হচ্ছে, যার বার্ষিক আর্থিক ক্ষতি প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরচুন বিজনেস ইনসাইটস-এর তথ্যমতে, বর্তমানে বৈশ্বিক ফল উৎপাদনকারী দেশগুলোর গড় প্রক্রিয়াকরণের হার ৪৫ শতাংশ, যা উন্নত বিশ্বে ৭০ শতাংশেরও বেশি। বিশ্বের শীর্ষ ফল উৎপাদনকারী দেশ চীন তাদের ফলের ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এবং থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া ৮০ শতাংশের ওপরে প্রক্রিয়াজাত করছে। বিশ্বব্যাপী ফল ও সবজি প্রক্রিয়াজাতকরণের বাজার ২০২৬ সালের ১১ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০ান্তর হয়ে ২০৩৪ সালের মধ্যে ২১ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই বিশাল বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের বর্তমান বিপণন অংশীদারিত্ব মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। দেশে বার্ষিক ফলের উৎপাদন ১ কোটি ৫১ লাখ টনের বেশি হলেও প্রক্রিয়াজাত পণ্যে রূপান্তর হচ্ছে মাত্র ৩ লাখ টনের মতো, যা আন্তর্জাতিক শুকনো খাবার রপ্তানির বাজারে বাংলাদেশকে ২৯২তম অবস্থানে নামিয়ে এনেছে। এদিকে, দেশে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা এক হাজারের বেশি হলেও তার ৯০ শতাংশই অতি ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, আর মাত্র ১০ শতাংশ মাঝারি ও বড় শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার, আকিজ, বসুন্ধরা, বম্বে সুইটস ও সেজানের মতো শীর্ষ ২০টি বড় প্রতিষ্ঠান এই খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং ৮০ শতাংশ রপ্তানি মাত্র ৬ থেকে ৭টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সম্পন্ন হচ্ছে। তবে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মূলত গতানুগতিক আচার, আমসত্ত্ব বা জ্যাম-জেলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই শিল্পের প্রসারে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বৈরী নীতি-সহায়তা। একটি খাদ্যপণ্যের ব্যবসা শুরু করতে এ দেশে প্রায় ৪২টি সংস্থার অনুমতি নিতে হয় এবং এরপর ব্যবসা পরিচালনায় যে অতিরিক্ত নবায়ন ও লাইসেন্স ফি দিতে হয়, তা প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। এছাড়া ফসল উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে ভারী ধাতু মিশে পণ্য অনিরাপদ হয়ে পড়ছে, যা বিশ্ববাজারে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন করছে এবং আন্তর্জাতিক মানের নিজস্ব টেস্টিং ল্যাব না থাকায় মান নিয়ন্ত্রণেও বেগ পেতে হচ্ছে। অন্যদিকে, কারিগরি ও গবেষণা খাতে দুর্বলতা ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে আরও পিছিয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশন (বাপা) এবং ফল বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে প্রক্রিয়াকরণের উপযোগী নির্দিষ্ট ফলের বাণিজ্যিক জাতের তীব্র সংকট রয়েছে। কোন জাতের ফল তাজা খাওয়া হবে আর কোনটি পাল্প বা ফ্রোজেন করা হবে, তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। তাছাড়া, মৌসুমি ফলগুলো মাত্র ৩-৪ মাসের মধ্যে প্রক্রিয়াজাত করে রাখতে হয়, যার জন্য মাইনাস ৭০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বিশেষায়িত সংরক্ষণাগার বা কোল্ড-চেইন অবকাঠামো প্রয়োজন, যা দেশে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এই খাতে কার্যকর গবেষণার জন্য কৃষি বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়, যেখানে সফল দেশগুলো অন্তত ২ শতাংশের বেশি বরাদ্দ রাখে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা আধুনিক ড্রাইং বা প্যাকেজিং যন্ত্রপাতির অভাবে নিজস্ব পদ্ধতিতে বিশ্বমানের পণ্য তৈরিতে হিমশিম খাচ্ছেন, যেখানে দেশে মাত্র ১২ শতাংশ প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (ওঝঙ ও ঐঅঈঈচ) নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। তথ্যমতে, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ড্রাগন ফল বা অ্যাভোকাডোর মতো বিদেশি ফলের উৎপাদন বাড়ায় এবং আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির কারণে তাজা ফল আমদানি গত কয়েক বছরে ৮ লাখ ৬২  টন থেকে কমে ৬ লাখ ২২ হাজার টনে নেমে এসেছে। তবে উৎপাদন বাড়লেও ফল রপ্তানি মাত্র ৭ থেকে ৯ হাজার টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। যেমন, বছরে ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টন কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও রপ্তানি হচ্ছে মাত্র ১ থেকে ২ হাজার টন, যা মোট উৎপাদনের ১ শতাংশেরও কম। রপ্তানি না বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে আকাশচুম্বী বিমান ভাড়া বা এয়ার ফ্রেইটকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা। সামপ্রতিক আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের অজুহাতে প্রতি কেজি ফলের বিমান ভাড়া ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৫৪৭ টাকায় পৌঁছেছে। ফলে ভারত, পাকিস্তান বা মিশরের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশি ফলের পরিবহন খরচ তিনগুণ বেশি পড়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের পণ্য প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাচ্ছে। বাজার বহুমুখীকরণ না হওয়া এবং উন্নত বিশ্বের চেইন শপগুলোতে প্রবেশ করতে না পেরে কেবল প্রবাসী বাংলাদেশিদের ‘এথনিক মার্কেট’-এর ওপর নির্ভর করে থাকায় ফল রপ্তানির বাজারটি বড় করা সম্ভব হচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে আধুনিক হিমাগার স্থাপন এবং লজিস্টিক খরচ কমানো না গেলে এই বিপুল সম্ভাবনাময় খাতটি অবহেলা আর অপচয়ের বৃত্তেই আটকে থাকবে।