গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সরকার কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেবে না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য, মিথ্যা প্রচারণা ও সাইবার বুলিং ঠেকাতে বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের সমন্বয়ে একটি প্যানেল গঠনের কথা জানিয়েছেন তিনি। এ প্যানেল ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অপতথ্য শনাক্তে কাজ করবে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন তথ্য উপদেষ্টা।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকারের কাজকর্ম নিয়ে সমালোচনা বা ব্যঙ্গ, বিদ্রূপে কোনো সমস্যা নেই। তবে আইন লঙ্ঘন করে কোনো কিছু করা যাবে না। রাষ্ট্রের নামে নাগরিকদের ওপর অন্যায় বা নিপীড়ন চালানো হবে না বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।
তিনি বলেন, “আইনের নামে আমরা নিপীড়ন চালাবো কিনা, এটাই মূল প্রশ্ন। উত্তর হচ্ছে, না। আমরা তা করবো না। কারণ আমরা কোনো ফ্যাসিস্ট বা মাফিয়া রেজিম নই। আমরা একটি গণতান্ত্রিক সরকার।”
অনলাইনে ভুল তথ্য, গুজব ও নারীদের হেনস্তা করে সাইবার বুলিংয়ের ঘটনা ঠেকাতে আইনজীবী প্যানেল গঠনের কাজ শেষ হয়েছে জানিয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।
তিনি বলেন, “আমরা যে কেউ ডিসইনফরমেশন, মারাত্মক মিথ্যা প্রচারণা বা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হতে পারি। এগুলো প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগীদের আইনি সুরক্ষা দিতে আইনজীবী প্যানেল গঠন করা হয়েছে।”
তথ্য উপদেষ্টা জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে এই প্যানেল কাজ করবে। পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেও অপতথ্য ও সাইবার বুলিং শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ থাকবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পাদকীয় যাচাই-বাছাইয়ের কোনো প্রক্রিয়া না থাকায় ব্যবহারকারীদের আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তবে অতীতে আইন অপব্যবহারের অভিজ্ঞতার কারণে নতুন কোনো ব্যবস্থা নিয়ে নাগরিকদের উদ্বেগ থাকাকে স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকারের বিরুদ্ধে গেলেই কোনো তথ্যকে সরাসরি অপতথ্য বলা হবে না। সমালোচনা ও মতপ্রকাশের অধিকার গণতান্ত্রিকভাবেই গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো কোনো কর্মকাণ্ডকেও সরকার প্রশ্রয় দেবে না বলে জানান তিনি।
সরকারের ১৮০ দিনের কার্যক্রমের হিসাব তৈরির কথাও জানান তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ১৮০ দিনে কী করার কথা ছিল, কী সম্পন্ন হয়েছে এবং কোন কাজ বাকি রয়েছে, তার একটি স্বচ্ছ হিসাব তৈরি করা হচ্ছে। এটি সরকারের জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এদিকে মাইলস্টোন বিমান দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখনো ক্ষতিপূরণ না পাওয়াকে সরকারের ব্যর্থতা হিসেবে স্বীকার করেন তথ্য উপদেষ্টা। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো অবশ্যই ক্ষতিপূরণ পাবে বলে জানান তিনি।
ঝিনাইদহে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য সরানোর বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর কারণে এটি সরানো হয়নি। নকশাগত ত্রুটি ও সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকায় জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তে ভাস্কর্যটি সরানো হয়েছে। নতুন স্থানে সঠিক অবয়ব ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরে নতুন করে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হবে।
চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়েও তথ্য দেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি জানান, ২০২৫ সালের ২০ জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১৭ হাজার ২১৮ জন এবং মারা গিয়েছিলেন ৬২ জন। চলতি বছরের একই সময় পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজার ৮৫৭ এবং মৃত্যু হয়েছে ৩৭ জনের। তার দাবি, আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন করে এলএনজি সরবরাহ চুক্তির কথাও জানান তিনি। ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনার আওতায় ইতোমধ্যে ২৯টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক ২৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুত নিশ্চিত হয়েছে, যার মধ্যে ১২৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
২০৩০ সালের মধ্যে অবশিষ্ট ১২১টি কূপ খনন শেষ করে দৈনিক আরও ১ হাজার ৪৯১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের সামুদ্রিক সম্পদ ও ব্লু ইকোনমি নিয়ে গবেষণার তথ্যও তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণায় সেন্টমার্টিন উপকূল থেকে ১৪৭ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১২টি নমুনা বিশ্লেষণ করে আগার, ক্যারাজিনান ও এলজিনেট নিষ্কাশনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।
মহেশখালী চ্যানেল, রেজুখাল নদী ও বোরি উপকূলে পরীক্ষামূলক ও পাইলট পর্যায়ে শৈবাল চাষও শুরু হয়েছে। এই প্রযুক্তি খাদ্য, ওষুধ ও শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদন এবং রপ্তানি বৃদ্ধিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে বলে জানান তথ্য উপদেষ্টা।
এ ছাড়া সেন্টমার্টিন থেকে দেশের মধ্য উপকূল পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় গবেষণা চালিয়ে ম্যাগনেটাইট, ইলমেনাইট, রুটাইল, জিরকন ও গার্নেটসহ বিভিন্ন ভারী খনিজের সন্ধান পাওয়ার কথা জানানো হয়। গবেষণা এলাকার এসব খনিজের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মূল্য প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে উল্লেখ করেন তিনি।