বগুড়ার শেরপুর উপজেলার চক খানপুর গ্রামের হাওলাদার পাড়া একসময় প্রায় ১৩০টি পরিবারের বসবাসে ছিল একটি প্রাণবন্তজনপদ। বাঙ্গালী নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই পাড়ার মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষিকাজ ও পারিবারিক বন্ধন মিলিয়ে চলছিল স্বাভাবিক ছন্দে। কিন্তু গত কয়েক বছরে নদীভাঙনের ভয়াবহতায় সেই চিত্র পুরোপুরি পাল্টে গেছে। ক্রমাগত নদীগর্ভে বিলীনহয়েছে আবাদি জমি, নষ্ট হয়েছে ফসল, হারিয়ে গেছে অসংখ্য বসতভিটা। অনেক পরিবার নিজেদের শেষ সম্বলটুকুও রক্ষা করতেপারেনি। পৈত্রিক ভিটা-মাটি চোখের সামনে নদীর পানিতে তলিয়ে যেতে দেখেও অসহায়ের মতো এলাকা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয়নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। আবার কেউ কেউ সবকিছু হারানোর আগেই সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন। বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙনের এই নির্মম বাস্তবতায় হাওলাদার পাড়ায় এখন অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র প্রায় ৬০টি পরিবার।এতদিন তাদের একমাত্র ভরসা ছিল, সরকারি উদ্যোগে হয়তো স্থায়ী নদীশাসন বা ভাঙনরোধী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সেই আশায় বুক বেঁধে তারা নিজেদের পৈত্রিক ভিটায় টিকে থাকার চেষ্টা করে গেছেন। কিন্তু চলতি বছরেও বাস্তবায়িত হয়নিতাদের সেই প্রত্যাশা। কার্যকর কোনো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় এবারের বর্ষাতেও নতুন করে ভাঙনের আতঙ্কে দিন কাটছেনদীপাড়ের মানুষের। প্রতি রাতেই তাদের মনে একটাই শঙ্কা এই বুঝি নদীর গর্ভে হারিয়ে যাবে শেষ আশ্রয়টুকুও।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু চলতি বছরেই নদীর তীব্র ভাঙনে প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিনই ভাঙননতুন নতুন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্ক আরও বাড়ছে। নদীর একেবারে কিনারায় বসবাস করা পরিবারগুলো এখন চরমঅনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অল্প সময়ের মধ্যেই অবশিষ্ট বসতভিটাও নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে। ভূক্তভোগী মংলা চন্দ্র হাওলদার (৫৫) বলেন, "চোখের সামনে নদী সব গিলে খাচ্ছে। সারাজীবনের কষ্টে গড়া ঘরটা এখনভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে। দিন-রাত শুধু একটাই ভয় কখন ঘুম থেকে উঠে দেখব, ঘরটা আর নেই। আমরা গরিব মানুষ, ভিটেমাটিহারালে মাথা গোঁজার আর কোনো ঠাঁই থাকবে না।"
উজ্জ্বল সরকার (৩৫) বলেন, "নদী থেকে যেভাবে বালু তোলা হয়েছে , তার জন্যেই এ বছর ভাঙন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠেছে ।আমরা চিৎকার করলেও কেউ শুনে না। একদিকে নদী ঘর কেড়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে সংসার চালানোর চিন্তা। মনে হয়, গরিবেরকান্নার কোনো দাম নেই।"
নদী শুধু ভিটেমাটি নয়, কেড়ে নিচ্ছে মানুষের নিরাপত্তাবোধ, স্মৃতি আর ভবিষ্যতের শেষ আশ্রয়টুকুও। নতুন করে জীবন শুরুকরার শক্তি বা সামর্থ্য অনেকেরই থাকে না; তাই ভিটেমাটি হারানোর ভয় তাদের কাছে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা। শ্রীমতী সবরী রানী (৪৫) বলেন, "পাশের বাড়িগুলো একে একে নদীতে চলে যেতে দেখেছি। এখন নিজের বাড়ির পালা। প্রতিদিনবুক ধড়ফড় করে আজ বুঝি আমাদের ঘরটাও নদীতে মিশে যাবে। সন্তানদের নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব, সেই উত্তর আমাদেরজানা নেই।"
বাঙ্গালী নদীর ভাঙনে সব হারানোর পথে পথযাত্রী প্রভাতী রানী (৮০) বলেন, "এই বয়সে আর কোথায় যাব বাবা? স্বামীররেখে যাওয়া এই ভিটাতেই সারাজীবন কাটিয়েছি। এখন যদি এটুকুও নদী নিয়ে যায়, তাহলে শেষ বয়সে রাস্তায় দাঁড়ানো ছাড়াআমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না। ভগবান জানেন, আমাদের কপালে কী আছে।" এ নদী ভাঙ্গন বিষয়ে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) বলেন, "ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা আমরা খুব দ্রুত পরিদর্শনকরবো এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাথে যোগাযোগ করে যথাযথ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের নিমিত্তে যদি জিও ব্যাগ বা কোন প্রটেকশন ওয়ার্ক লাগে সেই জন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করবো।" এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির বলেন, “নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দুর্ভোগবিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো চিহ্নিত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গেজরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আসন্ন বাজেটে বরাদ্দও চাওয়া হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া মাত্রই দ্রুত কার্যকরব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”