ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরালের প্রেক্ষাপটে নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পেয়ে জামায়াতে ইসলামীর সব পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী মো. নজরুল ইসলামকে। এখন তাঁর সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে কিনা- সে প্রশ্ন উঠেছে।
গণপ্রতিনিধি আদেশ-১৯৭২ এর ১২(খ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এমপি নির্বাচিত হতে বা পদে থাকতে পারবেন না, যদি তিনি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল মনোনীত না হন অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী না হন।
এদিকে সংশ্লিষ্ট আইন ও সংবিধান বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু দল থেকে বহিষ্কার হলেই কোনো সংসদ সদস্যের পদ বাতিল হয় না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সামনে আসে সংসদ সদস্য (বিরোধ নিষ্পত্তি) আইন, ১৯৮০, যার অধীনেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হতে পারে।
সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্য নির্বাচনের পর অযোগ্য হয়েছেন কি না বা ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার আসন শূন্য হবে কি না এ নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টি হলে তা শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাতে হবে এবং কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।
তবে, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে দল থেকে বহিষ্কারের কথা নেই। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো সংসদ সদস্য নিজে দল থেকে পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার আসন শূন্য হবে। ফলে গাজী নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রে কেবল বহিষ্কারের কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসন শূন্য হওয়ার সুযোগ নেই।
এ অবস্থায় সংসদ সদস্য (বিরোধ নিষ্পত্তি) আইন, ১৯৮০ অনুযায়ী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। আইনটির ৩ ধারা অনুযায়ী, কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে স্পিকার ৩০ দিনের মধ্যে একটি বিবৃতি প্রস্তুত করে তা শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠাবেন। ওই বিবৃতিতে বিরোধের তথ্য, সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য এবং বিরোধ উত্থাপনকারীর পরিচয় উল্লেখ থাকবে।
আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, স্পিকারের পাঠানো বিবৃতি পাওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন বিরোধের পক্ষগুলোর কাছে অনুলিপি পাঠাবে এবং লিখিত বক্তব্য আহ্বান করবে। পরে নির্ধারিত তারিখে শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। সংশ্লিষ্ট পক্ষ ব্যক্তিগতভাবে বা আইনজীবীর মাধ্যমে উপস্থিত থাকতে পারবেন এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন।
আইনের ৫ ধারা নির্বাচন কমিশনকে দেওয়ানি আদালতের মতো সমন জারি, সাক্ষ্য গ্রহণ, দলিল তলব ও সাক্ষী জেরা করার ক্ষমতা দিয়েছে। আর ৬ ধারা অনুযায়ী, স্পিকারের রেফারেন্স পাওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে কমিশন সিদ্ধান্ত দিয়ে তা স্পিকারের কাছে পাঠাবে। কমিশন আসন শূন্য ঘোষণা করলে সংসদ সচিবালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জামায়াত সরাসরি নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিলেই কমিশন পদক্ষেপ নিতে পারবে না। কারণ আইন অনুযায়ী, বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিষয়টি স্পিকারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের কাছে আসতে হবে।
অতীতেও এ আইনে একাধিক বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০০০ সালে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আখতারুজ্জামানের সদস্যপদ নিয়ে বিরোধের পর স্পিকারের রেফারেন্সে শুনানি করে নির্বাচন কমিশন তার আসন শূন্য ঘোষণা করেছিল।
এ ছাড়া, ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্যপদ নিয়ে একই আইনে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তবে, নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগেই তিনি সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করায় সে অনুযায়ী কার্যক্রম শেষ হয়।
দল থেকে বহিষ্কারের পর সংসদ সদস্যের পদ থাকবে কি না এবং পদটি কে শূন্য ঘোষণা করবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী বলেন, “এ বিষয়ে মূল এখতিয়ার সংসদের। নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় গেজেট প্রকাশ করতে পারে, তবে সংসদ সদস্যের আসন শূন্য ঘোষণার দায়িত্ব স্পিকারের কার্যালয় বা সংসদ সচিবালয়ের।”
তিনি বলেন, “কোনো দল যদি তাদের মনোনীত একজন সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করে, তাহলে তিনি আর ওই দলের সদস্য থাকেন না। যেহেতু, তিনি দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হয়েছেন, তাই বহিষ্কারের পর তিনি দলের প্রতিনিধি হিসেবে আর থাকেন না। সে ক্ষেত্রে তিনি অযোগ্য হয়ে পড়বেন এবং সংসদ সদস্যের পদটি শূন্য হবে।”
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “জামায়াতের চিঠি এখনো কমিশনের হাতে পৌঁছায়নি। চিঠি এলে এবং প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে।”