টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, আতঙ্ক নয়, বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের পথে বিএসটিআই

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ২৯ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৫৩ পিএম
টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, আতঙ্ক নয়, বৈজ্ঞানিক যাচাইয়ের পথে বিএসটিআই

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া উদ্বেগের মধ্যে বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। সংস্থাটি বলছে, কোনো পণ্যে প্লাস্টিকজাত কণা পাওয়া গেলেই সেটিকে ক্ষতিকর বা নিম্নমানের ঘোষণা করা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়। কণার ধরন, উৎস, পরিমাণ এবং সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি যাচাইয়ের পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সম্প্রতি এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ইএসডিও) পরিচালিত এক গবেষণায় বাজারে থাকা ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনার মধ্যে ২৬টিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার তথ্য প্রকাশ করা হয়। বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার পর ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।


এর পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিএসটিআইয়ের সম্পাদক মঈনুদ্দীন মিঞার সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংস্থাটির অবস্থান জানানো হয়। এতে বলা হয়, শুধু পরীক্ষায় প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে বলেই কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইচ্ছাকৃতভাবে তা ব্যবহার করেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। একইভাবে এসব কণা মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, এমন সিদ্ধান্তেও যাওয়ার আগে প্রয়োজন বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন।

বিএসটিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে পাঁচ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট আকারের প্লাস্টিক কণাকে বোঝায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, এটি একটি উদীয়মান পরিবেশগত ও স্বাস্থ্যগত উদ্বেগের বিষয়। এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে গবেষণা এখনো চলমান।

মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নানা উদ্যোগ রয়েছে। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাইক্রোবিড-ফ্রি ওয়াটার্স অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে টুথপেস্টসহ ধুয়ে ফেলা হয় এমন প্রসাধনীতে ইচ্ছাকৃতভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন অনুযায়ী, টুথপেস্টসহ রিন্স-অফ কসমেটিকসে মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহার বন্ধে উৎপাদকদের ১৭ অক্টোবর ২০২৭ পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে।

তবে বিএসটিআই বলছে, টুথপেস্টে অনিচ্ছাকৃতভাবে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য সীমা বা একক পরীক্ষাপদ্ধতি নির্ধারিত হয়নি। ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মানদণ্ডেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট মাত্রা বা নিষেধাজ্ঞার উল্লেখ নেই। একইভাবে ISO ও ASTM-এর মানেও টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের নির্দিষ্ট গ্রহণযোগ্য মাত্রা বা পরীক্ষার একক পদ্ধতি নির্ধারিত হয়নি।

বাংলাদেশে টুথপেস্টের জন্য ‘BDS 1216:2012 Specification for Toothpaste’ নামে নির্দিষ্ট মান রয়েছে। ২০১৯ সালের এসআরও নম্বর ৫০ ও ৫১-এর মাধ্যমে টুথপেস্ট উৎপাদন ও বাজারজাতের ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মান অনুযায়ী রাসায়নিক, মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ও নিরাপত্তা বিষয়ক পরীক্ষা করে লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বিএসটিআইয়ের নির্ধারিত মানে টুথপেস্ট উৎপাদনে ব্যবহারযোগ্য ৮১টি উপাদানের তালিকা রয়েছে। সেখানে মাইক্রোপ্লাস্টিকের নাম নেই। সংস্থাটির দাবি, সনদ দেওয়ার সময় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও যাচাই করা হয়। ফলে টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে অননুমোদিত মাইক্রোপ্লাস্টিক ব্যবহারের সুযোগ থাকার কথা নয়।

তবে সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফলকে হালকাভাবে দেখছে না বিএসটিআই। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইএসডিওর কাছ থেকে গবেষণার পূর্ণাঙ্গ তথ্য, পরীক্ষাপদ্ধতি, পরীক্ষার কাঁচা তথ্য বা ‘র’ ডেটা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য নথি চাওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে টুথপেস্ট উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের কাছ থেকে কাঁচামাল, পণ্যের উপাদান এবং সিনথেটিক পলিমার ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বাজার ও কারখানা থেকেও নমুনা সংগ্রহ করে দেশি বা বিদেশি স্বীকৃত পরীক্ষাগারে পুনরায় পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে বিএসটিআই।

সংস্থাটি বলছে, পুনঃপরীক্ষায় কোনো পণ্যে বাংলাদেশি মান না মানা বা অননুমোদিত উপাদান ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

একই সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ও আইনগত যাচাই শেষ হওয়ার আগে কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড বা টুথপেস্টকে অনিরাপদ কিংবা নিম্নমানের ঘোষণা না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বিএসটিআই।

বিষয়টি আরও পর্যালোচনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদপ্তর, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, দন্ত চিকিৎসক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ভোক্তা প্রতিনিধিদের নিয়ে টুথপেস্টের বাংলাদেশি মান পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া গেলে টুথপেস্টে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাস্টিক মাইক্রোবিড ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, উপাদান প্রকাশের বাধ্যবাধকতা এবং পরীক্ষাপদ্ধতি যুক্ত করে বিদ্যমান মান হালনাগাদ করা হতে পারে।

বিএসটিআই সাধারণ মানুষকে গুজব বা আতঙ্কে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি নিয়মিত মুখের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, টুথপেস্ট না গেলা এবং নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর আস্থা রাখার পরামর্শ দিয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে